
প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:৩৪

১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে শরীয়তপুর হানাদারমুক্ত হয়েছিল বিভিন্ন অঞ্চল। যদিও বর্তমান শরীয়তপুর জেলা মুক্ত হয় ১৫ অক্টোবর কিন্তু আজকের শরীয়তপুর জেলা মুক্তিযুদ্ধের সময় মাদারীপুর মহাকুমার অর্ন্তগত থাকায় মাদারীপুরের সঙ্গে মিল রেখে ১০ ডিসেম্বর শরীয়তপুর মুক্তদিবস পালন করা হয়।
তারা জানান, মে মাসের ২২-২৩ তারিখে রাজাকার, আলবদর, আলসামসদের সহযোগিতায় হানাদার বাহিনী এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গণহত্যা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায় সদর থানার মধ্যপাড়া গ্রামে। মধ্যপাড়া ও আশপাশের এলাকার শিশু, নারী, পুরুষ মিলে ৩৭৪ জনকে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। এদের অধিকাংশই ছিলো হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। এছাড়া মধ্যপাড়ার শতাধিক নারী পুরুষকে অস্ত্রের মুখে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মাদারীপুর এ আর হাওলাদার জুট মিলে। সেখানে নারীদের ধর্ষণ ও পুরুষদের গুলি করে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিফলক হিসেবে মধ্যপাড়ায় বধ্যভূমিতে কোনো মতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। তাতে মাত্র ৮১ জন শহীদের নাম উঠে এসেছে যারা এলাকার মানুষ ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন এলাকা থেকে আশ্রয় নিতে আসা অসংখ্য হিন্দু নারী-পুরুষ হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন তাদের কোনো তালিকা নেই।
এছাড়া সদর থানার উত্তর দক্ষিণ মধ্যাপাড়া, মালো পাড়া, ঝালো পাড়া, কাশাভোগ, নীলকান্দি, আংগারিয়া বাজার, ধানুকা, পাল বাড়ি, কোটাপাড়া বাজার, নড়িয়া থানার গোলার বাজার, তেলিপাড়া, ভূমখাড়া বিঝারি গ্রামের হিন্দু ও মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় হানাদার বাহিনী। স্বজনদের সামনে অসংখ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের পুরুষদের গুলি করে হত্যা করা হয় এবং অসংখ্য নারীদের ধর্ষণ করা হয়।

জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভেদরগঞ্জের মহিষারে ২ শতাধিক হানাদার ও তাদের দোষরদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এতে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। তাদের গ্রুপ কমান্ডার ছিলেন আক্কাছ মিয়া। মহিষারেই ওই ১১জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে গণকবর দেওয়া হয়।
রাজাকারের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পালং থানায় মুক্তিযোদ্ধারা ২৮ নভেম্বর গভীর রাতে অপারেশন চালায়। এ অপারেশনে দু'জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং অসংখ্য হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকার মারা যায়। এই থানা অপারেশনে নেতৃত্ব দেন মুক্তিযোদ্ধা মাস্টার ইদ্রিস আলী, আবুল কাসেম মৃধা ও মুক্তিযোদ্ধা আলী আজম সিকদার।
১৮ জুলাই ডামুড্যা দামুদর নদীতে একটি লঞ্চে করে পাক হানাদাররা এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালালে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে শক্তি সঞ্চয় করে পাল্টা হামলা চালায়। এতে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা পানিতে ডুবে মারা যায়। ডামুড্যা, ভেদরগঞ্জ, গোসাইরহাট থানায় যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন মুক্তিযোদ্ধা আ. মান্নান রাঢ়ী ও ইকবাল হোসেন বাচ্চু। নড়িয়া থানার মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, মুক্তিযোদ্ধা ইউনুস আলী মিতালী, মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী, মুক্তিযোদ্ধা হাসান আলী। জাজিরায় মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান ও মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান।
২০১০ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে শরীয়তপুরের কুখ্যাত ৮ জন রাজাকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ তালুকদার। সে মামলায় ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর পালং থানার কুখ্যাত রাজাকার সোলায়মান মোল্লা ও ইদ্রিস আলী সরদারের ফাঁসির আদেশ হয়। ফাঁসির আদেশের পর সোলায়মান মোল্যা কারাগারে মারা যান। ইদ্রিস আলী পলাতক রয়েছেন এবং বাকিরা আগেই মারা গেছে।
ইনিউজ ৭১/টি.টি. রাকিব