প্রায় ১০০০ বছর পূর্বে সৈয়দ শেখ আবদুল কাদির জিলানী (র) মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট খুতবাটি দিয়েছিলেন।
তিনি মিম্বরে উঠে বললেন, "এক হাজার মসজিদ বানানোর চেয়ে একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তির পেটে কিছু খাবার পৌঁছানো উত্তম। দামি কাপড়ের গিলাফ দিয়ে মসজিদুল কাবাকে ঢেকে ফেলার চেয়ে ক্ষুধার্তকে খাদ্য সরবরাহ করা ভালো। সারারাত নামাজ ও সিজদায় দাঁড়িয়ে থাকার চেয়েও মহৎ কাজ এটি। খোলা তরবারী হাতে জিহাদ করার চেয়ে উত্তম কাজ হচ্ছে ক্ষুধার্তকে পেটপুরে খাওয়ানো।
প্রচন্ড গরমের দেশে সারা বছর রোজা রাখার চেয়েও মহৎ কাজ এটি। রুটির আটা যখন ভুখা মানুষের মুখ গহ্বর থেকে পেটের দিকে নামতে থাকে তখন তার মাঝে একটি আধ্যাতিক নূর থাকে যার আলো সূর্যের আলোর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। যিনি ক্ষুধার্তকে খাওয়ান তাঁর জন্যে সুসংবাদ রয়েছে।"
হিজরির পঞ্চম শতকে তাঁর লেখা "গুনইয়াতুত তালিবিন" গ্রন্থে তৎকালীন সময়কার ধর্মীয় বিভ্রান্তি থেকে ইসলামি দর্শনকে মুক্ত করার জন্য আল্লাহ তাঁর লেখনীতে অনেক জ্ঞানের কথা ঢেলেছেন।
তিনি বলতেন, শুধু প্রতিমাপূজার নামই শিরক নয়, প্রবৃত্তির দাসত্ব করাও শিরকের শামিল। মুমিনের কাজ তিনটি - আল্লাহর হুকুম পালন করা, তাঁর নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর ইচ্ছার সাথে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া।
তিনি আরো বলতেন, প্রথমে ফরজ, পরে সুন্নত ও তারপরে নফল। ফরজ ছেড়ে সুন্নত ও নফল নিয়ে মশগুল থাকা বোকামী। সুন্নত বাকি রেখে নফলে মনোযোগী হবারও কোনো মূল্য নেই। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলতেন, ফরজ ছেড়ে দিয়ে সুন্নত ও নফল নিয়ে থাকা বাদশাহকে পরিত্যাগ করে গোলামের খিদমতে আত্মনিয়োগের শামিল।
শায়খ আবদুল কাদের জিলানি (রহ)কে আমাদের দেশে "বড়পীর" নামে যে ধারণা আর মর্যাদা দেয়া হয় প্রকৃত শায়খের সাথে এর কোন মিল নেই।
হিজরি পঞ্চম শতকে তৌহিদি দর্শন ও অনৈসলামিক দর্শন একাকার হয়ে স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে ইসলাম। তখন তিনি শরিয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারেফাতের নির্ভুল পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। শায়খ জিলানি বৈরাগ্য শিক্ষা দেননি। আবার তিনি দুনিয়াকে পরিমাণমতো উপভোগ করতেও নিষেধ করেননি। তবে দুনিয়াকে উপাসনা, দাসত্ব করা আর ভালোবাসতে নিষেধ করেছেন।
বলা হয় তাঁর ফিলসফির মুলতত্ব ছিলো রাসুল (সা) এর একটি কথা, --"অবশ্যই পৃথিবীকে তোমাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে আর তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে পরকালের জন্য।"
পার্সিয়ার কাস্পিয়ান সাগরের তীরে জিলান শহরের অধিবাসী হবার কারণে তাঁর নামের শেষে জিলানী যুক্ত হয়ে যায়। অনুরোধ থাকা স্বত্বেও তিনি জীবনে কখনো কোন বাদশাহ বা সুলতানের সামনে যাননি।
হিজরি ৬৬২ সালে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। তাঁর চার স্ত্রীর গর্ভে ২৭ পুত্র ও ২২ কন্যা জন্মগ্রহণ করেছিলো।
প্রতিবছর ফাতেহা ই ইয়াজ দাহম হিসেবে যে দিনটি শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হয় সেটি এই মনীষীর মৃত্যুর দিন।