
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২২, ২০:৩৭

ফরিদপুরের একটি গ্রামে ৬২ জনের একটি সংঘবদ্ধ ‘‘ডিজিটাল প্রতারক’’ চক্রের খোঁজ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চক্রটি মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব করে তারা অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে তারা “টোপ পার্টি”র সদস্য হিসেবে পরিচিত।
প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এক নারী গ্রাহকের ১ লাখ ৭ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গত বছরের ১৯ জানুয়ারি রাজধানীর শাহজাহানপুর থানায় মামলা হয়। ওই মামলা তদন্ত করতে গিয়ে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার ডুমাইন ইউনিয়নের পশ্চিম পাড়া গ্রামে ওই চক্রের সদস্যের সন্ধান পায় সিআইডি।
সিআইডির এক তদন্ত প্রতিবেদনে, ডুমাইনের পশ্চিম পাড়ার শাহারুপ শেখের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্রতারণার অভিযোগে মধুখালী থানায় দুটি মামলা থাকার তথ্য মিলেছে। এ ছাড়া ময়নাল শেখ, রতন শেখ, ওবায়দুল কাজী, সাগর কাজী, তপন শেখ, মেহেদী হাসান, মিঠুন শেখ, মিলন শেখ, আশরাফুল শেখ, ইলিয়াস শেখ, রিপন শেখ ও আবদুল কাদের শেখের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মামলাগুলো সব ডিজিটাল প্রতারণার। ২০১৮ সাল থেকে গত মার্চ পর্যন্ত এ মামলাগুলো হয়েছে বলেও প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে।
সিআইডি জানিয়েছে, প্রতারক চক্রের সদস্যরা কয়েক বছর ধরে মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। এক বছর আগে রাজধানীর শাহজাহানপুর থানার ওই মামলার তদন্ত করতে গিয়ে মধুখালীর পশ্চিম পাড়া গ্রামের ৬২ জন প্রতারকের পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা বের করেন তারা। গত ২৮ মার্চ তাদের বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।
কোনো ট্যাগ পাওয়া যায়নি

অভিযোগপত্রভুক্ত ১৫ জনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার প্রমাণ মিলেছে। এ মামলায় আরও ১০ জন সম্পৃক্ত রয়েছেন, যাঁদের বাড়ি ডুমাইনে। তবে পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা না পাওয়ায় তাঁদের অভিযোগপত্রভুক্ত করা হয়নি।অভিযোগপত্রের তথ্য বলছে, এই চক্রের সদস্য সোহান, ইকলাছ, ময়নাল ও খায়ের টাকার বিনিময়ে বিকাশের বিভিন্ন দোকানে টাকা পাঠানোর খাতার ছবি সংগ্রহ করেন।
পরে তা প্রতারক চক্রের সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। এরপর প্রতারক চক্রের সদস্যরা নিজেদের দোকানদার পরিচয় দিয়ে ভুলে টাকা চলে গেছে বলে গ্রাহকের কাছে তা ফেরত চান। পরে গ্রাহকের বিকাশ নম্বর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রতারণার ফাঁদে পড়া গ্রাহকরা পিন নম্বর দিয়ে দেন। তখন প্রতারক চক্র বিকাশ নম্বর চালু করার ফাঁদ পেতে টাকা আদায় করে থাকেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির সিরিয়াস ক্রাইম বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) এমদাদুল কবির বলেন, ‘‘ডুমাইনের পশ্চিম পাড়ার ৬২ জন লোক ডিজিটাল প্রতারণায় জড়িত। তাদের মধ্যে ৮ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে মোট ৬৪ জনের সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকিরা পলাতক।’’
ভুক্তভোগী বীথিকা গড়াই নামে এক নারী বলেন, ‘‘আমি তো বুঝতেই পারিনি যে ডিজিটাল প্রতারকদের খপ্পরে পড়েছিলাম। একজন ফোন করে আমাকে বলেছিল, আপনার নম্বরে টাকা চলে গেছে। ভুল করে বিকাশ অফিসে ফোন করে আপনার নম্বর বন্ধ করে দিয়েছি। পরে আরেকটি নম্বর থেকে আমার মোবাইলে কল আসে। তখন বিকাশ নম্বর সচল করার জন্য আমার পিন নম্বর জানতে চায়। আমি তখন বলে দিয়েছিলাম। এভাবে আমি প্রতারকদের ফাঁদে পড়ি।’’

বিকাশের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, ‘‘ফরিদপুরসহ আশপাশের জেলার অনেকে আগে থেকে ডিজিটাল প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ নিয়ে মামলা হয়েছে। এই ডিজিটাল প্রতারকদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। আমরা বলতে চাই, বিকাশ কোনো গ্রাহকের কাছে ওটিপি কিংবা পিন কোড জানতে চায় না। গ্রাহক যদি এ ব্যাপারে সচেতন থাকে, তাহলে প্রতারিত হওয়ার সুযোগ নেই।’’
সরেজমিনে ফরিদপুরের মধুখালীর ডুমাইন ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, পশ্চিম পাড়া ও ডুমাইন গ্রামে নতুন নতুন বাড়ি নির্মাণ হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্রতারণার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ, তারাই এসব বাড়ি তৈরি করছেন। কয়েক বছর আগেও তাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না।
এলাকাবাসীর কয়েকজনের অভিযোগ, ডুমাইন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান শাহ্ আসাদুজ্জামান (তপন) ও বর্তমান চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলম (মাসুম) অপরাধীদের মদদ দিয়ে থাকেন। তবে দুইজনই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০২০ সালের ১৮ ডিসেম্বর ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান “টোপ পার্টি”র সদস্যদের আত্মসমর্পনের আহ্বান জানিয়ে একটি সমাবেশ করেন। ওই সমাবেশে টোপ পার্টির ৯৫ জন উপস্থিতও ছিলেন। সেদিন তারা অপরাধের এ পথ থেকে ফিরে আসার শপথ নেন। তবে এলাকাবাসী বলছেন, ‘‘যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল, তারা স্বাভাবিক জীবনে আসেনি।’’
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান বলেন, ‘‘টোপ পার্টির উৎপত্তি ডুমাইনে হলেও তাদের নেটওয়ার্ক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মধুখালীর ডুমাইন বর্তমানে একটি অচ্ছুত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়েছে। অপরাধীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এলাকাবাসীর উদ্যোগ দরকার। পুলিশও সব ধরনের সহায়তা করবে।’’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, ‘‘একটি গ্রামে এতজন মানুষের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা স্বাভাবিক নয়। নিশ্চয় সেখানকার সামাজিক ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাব রয়েছে। কারণ, সামাজিক নজরদারি কম থাকলে সেখানকার মানুষের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। তবে কেন একটি গ্রামে এত মানুষ অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন, তার কারণ অনুসন্ধানে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে পর্যালোচনা জরুরি। এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত পদক্ষেপ লাগবে।’’