
অভাব অনটনের সংসার। ৮ বছর ধরে অন্যের পুকুর পারের এক খন্ড জমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করে আসছিলেন নওগাঁ সদর উপজলোর বোয়ালিয়া ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের মগর আলী ও তার স্ত্রী ছামিলা ।
গত ৩৫বছর আগে ঘর বাড়ি নদী ভাঙ্গনে তলিয়ে গেলে জীবিকার তাগিতে পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার নাউতারী গ্রাম থেকে স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে নওগাঁতে চলে আসেন মগর আলী। নওগাঁ সদর উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামে শ্বশুর বাড়ির পাশে দেড়কাঠা জমির ( আড়াই শতাংশ ) জমি কিনে কোন রকমে বসবাস করে আসছিলেন।
জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্যের জমিতে কৃষি কাজ করতেন। অভাবের সংসারে দিন-রাত পরিশ্রম করে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে কৃষি শ্রমিক এর কাজ করেন।
১০বছর আগে ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন । তাদেরও এক ছেলে সন্তান হয়েছে। কিন্তু বৃদ্ধ-মা বাবার স্থান হয়নি সন্তানদের সাথে থাকার। শ্যালোকের দেয়া পুকুর পাড়ে একটি ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করে আসছিলেন র্দীঘ ৮বছর যাবৎ।
কেউ গৃহহীন থাকবেনা প্রধানমন্ত্রীর এমন উদ্যোগ যেন আর্শীবাদ হয়ে শেষ বয়সে আলো জাগিয়ে বৃদ্ধ মগর আলী ও তার স্ত্রী ছামিলা খাতুনের মনে।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুর -আল -মামুন আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওয়ায় যৌথভাবে তাদের দেয় তালিকাতে। আজ ( রবিবার ) বেলা ১১টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহহীনদের ঘর প্রদান অনুষ্টানের আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভোধন করেন।
এর পর নওগাঁর জেলা প্রশাসক হারুন অর রশীদ মগর আলী ও তার স্ত্রী ছামিলা খাতুনকে ঘরের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও চাবি তুলে দেয়।
ঘর পেয়ে অনুভূতির কথা জানতে চাইলে মগর আলী বলেন, প্রায় ৩৫বছর আগে বন্যার কারনে ঘর নদীতে তলা যায়। তার পর পঞ্চগড় থাকা পরিবার লিয়া নওগাঁত চলা আসি। এটি শ্বশুর বাড়ি। শ্বশুর বাড়ির পাশে দের কাঠা জমি কিনা ছোট ঘর করি।
তার পর থাকা মানসের বাড়িত কাজ কাম করা মেলা কষ্টে ছোল-পোলোক মানুষ করা বড় করা তুলা তিন বেডি ও এক বেটাক বিয়া দিছি। ১০বছর আগে বেটাকও বিয়া দেয়ার পর তার একটা বেটা ছোল হছে। সংসার বাড়া গেছে। তাই হয়তো বেটার কাছে হামার আর হামার স্ত্রীর ঠাই হয়নি।
মগর আলী আক্ষেপ করে বলেন, তারাই সুখে থাক ছোল-পোল সেভাবে খোঁজ খবর লেয় না হামাকে। তারাও কাজ-কাম করাই খায়, তারকেও বেশি আয় হয়না। তাই কি আর করমু হামার শ্যালোক শরিফ এর পুকুর পাড়োত ছোট জাগাত একটা ঝুপরি ঘর করা কোন রকমোত ৮বছর ধরা এ্যানা খাইয়া-পরা বাঁচা আছি।
শরীলোত আর আগের মতোন শক্তি পাইনা। যেকনা পরি মানসের বাড়ি শ্রমিকের কাম করা পেটডা চালাই। আর এ্যানা বয়স্ক ভাতা পাই হামরা সেডা দিয়াই কোন রকমকে চলা যাচ্ছে। ইচ্ছা থাকলেও তেমন ভালো খাবার কিম্বা চিকিৎসার করবার পারিনা। বয়স হছো মাঝে-মাঝেই অসুক লাগাই থাকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া উপহারের ঘর পেয়ে কেমন লাগছে অনুভূতির কথা জানতে চাইলে মগর আলী বলেন, সেডা তো বাপো ভাষাত প্রকাশ করবার পারমুনা। যে ঘরোত এতদিন আসনু বৃষ্টি আলেই পানি পরে। ঝড় আসলে ভয় লাগে কখনো ঘর উড়া যাবে। হাসিনা মায়ের জন্ন্যি অনেক দোয়া করি মাডায় যেন ভালো থাকে।
কত সরকার গেছে, আসিছে , কেউ হামাকে খোঁজ লেইনি। কেংকা আছি। কি দরকার হামাকে মত বৃদ্ধ গরীব মানুষের। কিন্তু হাসিনা মা ঘর দিছে, বয়স্কভাতা দিছে। হামাকে মত গরীব মানুষের দিকে ফিরা থাকাছে। দোয়া করি হাসিনা মা যেন ভালো থাকে । দেশের মানুষের জন্ন্যি আরও মেল্যা ভালো কাজ-কাম করে।
মগর আলীর স্ত্রী ছামিলা খাতুন বলেন, ৩৫ বছর আগোত স্বামী ও ছোল-পোল লিয়্যা বাপের বাড়ি চলা আসি। ছোল-পোল গুলাক বিয়া দেয়ার পর হামাকোক আর দেখার মত কেউ নাই। মেলা কষ্ট করা বাঁচা আসি। লিজের মাথাগোজার ঘর আসলোনা। আজ হাসিনা মা ঘর দিছে। ঘরের দলিল দিছে। গর্ব করা বলবার পারি একন থ্যাকা লিজের ঘরোত থাকমু যত দিন বাঁচা আসি।
শেখের বেটির জন্য দোয়া করিচ্ছি যেন ভালো থাকে। মা,বাপ হারা হাসিনা মাডা হামাকে মত অসহায় মা-বাপের কষ্ট বুঝা ঘর দিছে। লিজের ছোল-পোল হামাকে দুঃখ বুঝলো না। কিন্তু হাসিনা মা ঠিকিই বুঝিতে দেশের গরীব মানুষের কথা।
হাসিনা মাডা যদি কোন দিন নওগাঁত আসে হামাকোক এ্যানা জানাবিন মাক কাছ থাকা দেখ্যা এ্যানা কপালোত চুমা খামু। মাডার বাপ নাই, মা বাপ মাও হারানার কষ্ঠ বুঝে।
এমন সহজ মনের সরল অভিব্যক্তি যেন পরম প্রাপ্তি একজন দেশ প্রধানের। আশ্রয়ন-২প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে (২য় পর্যায়ে ) ৫৩,৩৪০টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে প্রদান করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নওগাঁ জেলার ১১টি উপজেলায় মোট ৫০২টি ঘর গৃহ ও ভূমিহীন পরিবারকে ঘর প্রদান করা হয়েছে।
এ উপলক্ষে রবিবার বেলা ১১টায় নওগাঁ সদর উপজেলা অডিটোরিয়াম সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় জেলা প্রশাসক মোঃ হারুন অর রশিদ, সিভিল সার্জন ডাঃ এবিএম আবু হানিফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একেএম চিশতী, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার হারুন অল রশিদ,
জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি নির্মল কৃষ্ণ সাহাসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও উপকারভোগীরা উপস্থিত ছিলেন।
জেলা প্রশাসক মোঃ হারুন অর রশীদ জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধনের পর ২ শতাংশ খাস জমি বন্দোবস্তপৃবক, কবুলিয়ত ও নামজারিসহ ১১টি উপজেলার ৫০২টি উপকারভোগীদের হাতে এসব ঘর হস্তান্তর করা হয়।
তিনি আরো বলেন, প্রতিটি ঘরে দুইটি কক্ষ, একটি টয়লেট, রান্নাঘর, কমনস্পেস ও একটি বারান্দা আছে। এসব গৃহ প্রত্যেক পরিবারের জন্য আলাদা করে নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি গৃহ নির্মাণে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার টাকা।
এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১০টি, বদলগাছী ৯টি, মহাদেবপুর ৭৬টি, আত্রাই ১০টি, রানীনগর ৩৩টি, মান্দা ২১টি, পতœীতলা ১১৭টি, ধামইরহাটে ২০টি, পোরশা ৭১টি, নিয়ামতপুরে ৭৫টি, সাপাহারে ৬০টি গৃহহীন ও ভৃমিহীন পরিবার এসব ঘর পাবেন।
উল্লেখ্য এর আগে ২৩ জানুয়ারি জেলায় ১ হাজার ৫৬টি গৃহহীন ও ভৃমিহীন পরিবারের মাঝে এসব ঘর করে হস্তান্তর করা হয়।