
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২১, ১৭:২৭

ঘোড়ার গাড়ি বলতে একসময় ছিল রাজা-বাদশাহদের বাহন। সাধারণ মানুষের কল্পনার মধ্যে ছিল না ঘোড়ার গাড়িতে চড়ার বিষয়টি। গ্রামের সাধারণ মানুষ প্রয়োজনে ঢাকা শহরে গেলে নবাবপুর রোডে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি (টমটম) দেখে থমকে দাঁড়ান একনজর দেখার জন্য।
কেউ কেউ টাকার বিনিময়ে ওই ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে শখ মেটানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজকীয় আদলে না হলেও ঘোড়ার দিয়ে টানা গাড়ি এখন জনপ্রিয় বাহন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে ভূঞাপুরের চরাঞ্চলসহ প্রত্যন্ত এলাকায়।
জীবন-জীবিকার তাগিদে সময়ের চাহিদা মেটাতে মানুষ একেক সময় একেক পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়। এতদাঞ্চলের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী বাহন বলতে ছিল গরুর গাড়ি। গরুর গাড়িকে নিয়ে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী কতইনা বন্দনা করতেন।
গরুর গাড়ির চাকাসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ প্রস্তুত, ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ছিল হাজার হাজার মানুষ। অনেক স্থানেই এটি শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু কালের চাহিদা মেটাতে গিয়ে গরুর গাড়ি এ অঞ্চল থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথে।
আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার যুগ ও কালের বিবর্তনে গ্রাম বাংলার মানুষের একমাত্র যোগাযোগের বাহন ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার হারিয়ে গেলেও যমুনার চরাঞ্চলের মালামাল ও মানুষের যোগাযোগের বাহন হিসেবে এখনও ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন রয়েছে।
বর্ষার সময় যোগাযোগের মাধ্যম নৌকা আর কালের পরিক্রমায় শুকনো মৌসুমে চরাঞ্চলের মালামাল বহনের একমাত্র বাহন হলো ঘোড়ার গাড়ি।
নদীর পানি নেমে যাওয়ায় যমুনার চরাঞ্চল এখন মরুভূমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এ কারণে চরবাসী নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল ঘোড়ার গাড়িযোগে বহন করে থাকে। বিকল্প হিসেবে আবার অনেকে হেঁটেই নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যমুনার নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে চর জাগতে শুরু করে। চর জাগলেই শুকনো মৌসুমে যোগাযোগের বাহন হয়ে দাঁড়ায় ঘোড়ার গাড়ি। শুকনো মৌসুমে চরবাসী তার লালিত স্বপ্নের ফসল চাষ করতে থাকে।
চরাঞ্চলে সাধারণত বাদাম, ভুট্টা, মসুর ডাল, কাউন, বোরো ধান, মিষ্টি আলু চাষ হয়ে থাকে। এসব ফসল চাষ করার জন্য চাষিরা জমি প্রস্তুত করতে শুরু করেছে, যার কারণে এখন চরাঞ্চলে যোগাযোগ খুব কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। দু’চোখ যত দূর যায় শুধু শুকনো মাঠ আর বালু। এ কারণে চরাঞ্চলের মানুষের মালামালের বাহন হিসেবে ঘোড়ার গাড়িই এখন একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চরাঞ্চলের চাষিরা তাদের উৎপাদিত ফসল তোলে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্যও একমাত্র মাধ্যম হলো এ ঘোড়ার গাড়ি। চরাঞ্চলে কোনো রাস্তাঘাট না থাকায় অধিকাংশ ঘোড়ার গাড়ির চালকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ছুটে বেড়াচ্ছে এক চর থেকে অন্য চরে।
ভূঞাপুর উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের নিকলাপাড়া চরাঞ্চলের মজিদ মিয়া (৪৫) নামে এক ঘোড়ার গাড়ির চালক বলেন, আমরা গরিব মানুষ, কাম না করলে খামু কী। সংসার চালানোর জন্য এখন ঘোড়ার গাড়ি চালাচ্ছি। বর্ষাকালে অন্যের বাড়িতে কাজ করে খাই।এখন প্রতিদিন ১২০০-১৫০০ টাকা উপার্জন করা যায়।
পুংলিপাড়া চরের মঙ্গল (৪২) বলেন, গাবসারা ইউনিয়নের সবগুলো গ্রামই চরের মধ্যে, তাই মানুষের মালামাল নেওয়ার জন্য ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার অনেক বেশি। শুকনো মৌসুমে এ চরাঞ্চলের মানুষের ও প্রয়োজনীয় মালামাল বহনের একমাত্র মাধ্যম হলো ঘোড়ার গাড়ি। আমি প্রায় এক যুগ ধরে ঘোড়ার গাড়ি চালাই। তবে ঘোড়ার পেছনে যে টাকা খরচ হয় অনেক সময় তা উঠাতেও পারি না।
সোহাগীপাড়া চরের জাহাঙ্গীর (১৪) বলেন, ছোট বয়স থেকেই উপার্জনে নেমেছি।আমরা গরীব মানুষ। তাই কাজ করে খেতে হয়।দিনে ৬০০-৮০০ টাকা উপার্জন করা যায়। অগ্রহায়ণ থেকে জৈষ্ঠ্য মাস পর্যন্ত উপার্জন করা যায়। তারপর বর্ষা এলে উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়।ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে যা উপার্জন করি তা দিয়ে ভালোভাবেই সংসার চলে।
#ইনিউজ৭১/জিয়া/২০২১