একসময় ঝালকাঠির নদীবন্দর ঘিরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলত লবণের জমজমাট কর্মযজ্ঞ। কক্সবাজারসহ উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নৌপথে ঝালকাঠিতে আসত অপরিশোধিত লবণ। ঘাটে নোঙর করত নৌযান। শ্রমিকেরা মাথায় করে বস্তা নিয়ে কারখানা, ঘাট ও আড়তের মধ্যে ছুটে বেড়াতেন। কারখানাগুলোতে লবণ পরিষ্কার, পরিশোধন, আয়োডিন মেশানো, শুকানো ও প্যাকেটজাত করার কাজে ব্যস্ত থাকতেন শত শত শ্রমিক। পরে নৌ ও সড়কপথে সেই লবণ ছড়িয়ে পড়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কর্মচাঞ্চল্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী লবণশিল্পে বড় ধস নেমেছে। একসময় ছোট-বড় মিলিয়ে ২০টির বেশি লবণকল থাকলেও এখন চালু রয়েছে মাত্র আটটি।
বর্তমানে নিউ ঝালকাঠি সল্ট, এ.আর.এস সল্ট, দি ক্রিসেন্ট সল্ট, লাকী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, ধাঁন সিড়ি সল্ট, শরীফ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ, তাজ সল্ট ক্রাশিং ও মনিলাখ সল্ট চালু রয়েছে। মিতালী, নূর, কুমিল্লা, মদিনা, মিনি ও সুরভীসহ আরও অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। চালু আটটি মিলের মধ্যে তিনটি আধুনিক এবং পাঁচটি পুরোনো প্রযুক্তিতে উৎপাদন করছে। এসব মিলে মাসে গড়ে ১ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টন এবং বছরে প্রায় ২০ হাজার ৪০০ থেকে ২৬ হাজার ৪০০ টন ভোজ্য ও শিল্প লবণ উৎপাদন হয়। এতে প্রায় এক হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং বছরে ২০০ কোটি টাকার বেশি বিক্রি হয়।
ব্রিটিশ আমল থেকেই ঝালকাঠি ও আশপাশে লবণের ব্যবসা চলে আসছে। নদীপথের সুবিধায় ঝালকাঠি দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয় এবং একসময় ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ হিসেবেও পরিচিতি পায়। বাসন্ডা নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছিল বহু সনাতন পদ্ধতির লবণকল। বর্তমানে লবণ পরিশোধনের পাশাপাশি তা বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং দেশের অন্য অঞ্চলেও সরবরাহ করা হয়। একসময় বৃহত্তর ফরিদপুর, খুলনা, রাজশাহী, বরগুনা, ভোলা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ ১৭টি জেলায় ঝালকাঠির লবণ যেত। মাছের ঘের, শুঁটকি, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজে লবণের ব্যবহার রয়েছে। ফলে এ শিল্পের সঙ্গে মিল মালিকের পাশাপাশি আড়তদার, নৌযান মালিক, পরিবহন শ্রমিক, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও যুক্ত।
তবে চীন, ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা শিল্প লবণ ও সোডিয়ামভিত্তিক লবণের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং বড় কোম্পানির আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন স্থানীয় কারখানাগুলোকে চাপে ফেলেছে। মিল মালিকদের অভিযোগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও সহজে ব্যাংকঋণ পাওয়া যায় না। পুরোনো প্রযুক্তি, শ্রমনির্ভর উৎপাদন ও অর্থসংকটে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ও উদ্যোক্তাদের চাপে ফেলছে। নিউ ঝালকাঠি সল্টের মালিক আবু বক্বর সিদ্দিক জানান, আধুনিক মেশিনে খরচ কিছুটা কমলেও তেলের দাম বেড়ে আবার ব্যয় বেড়েছে। তাজ সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক মো. ইলিয়াছও বেচাকেনা কমে যাওয়া এবং কক্সবাজার থেকে লবণ আনতে বাড়তি ব্যয়ের কথা জানান।