
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪০

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প নিয়ে যারা বাস্তবে কাজ করেন, তারাই বর্তমান শ্রমিক সংকটের ভয়াবহতা সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারছেন। বাইরে থেকে বিষয়টি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। আমি নিয়মিত প্রতি মাসে তিন-চারটি গার্মেন্টস কারখানায় কাজ করাই। সেই অভিজ্ঞতা থেকে গত কয়েক বছরে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে ছোট ও মাঝারি গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে শ্রমিক পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
একজন দক্ষ শ্রমিক হয়তো মাসে ১৮–২০ হাজার টাকা আয় করেন। একজন হেলপার হয়তো ১২–১৫ হাজার টাকা পান। তবে সমস্যাটা হচ্ছে, এই বেতন দিয়েও এখন প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে একটি কাজ শেষ করতে যেখানে আগে একদিন বা দুইদিন লাগত, এখন অনেক সময় তিন-চারদিনও লেগে যায়। কারখানার মালিকদের সঙ্গে কথা বললে অনেকেই বলেন, “ভাই, এটা তো আমাদের দোষ না। শ্রমিকই পাওয়া যাচ্ছে না।” কিন্তু প্রশ্ন হলো শ্রমিকরা গেল কোথায়?
বর্তমানে শহরের রাস্তায় টেসলা ও বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারিচালিত ছোট যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একজন মানুষ যদি একটি টেসলা নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে দৈনিক ভালো অঙ্কের আয় করতে পারেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তার কাছে দীর্ঘ সময় কারখানায় কাজ করার তুলনায় এই পেশাটি বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। ধরা যাক, একজন শ্রমিক কারখানায় মাসে ১৮–২০ হাজার টাকা আয় করেন। অন্যদিকে একটি টেসলা চালিয়ে যদি তিনি দৈনিক গড়ে ১,০০০ টাকা আয় করতে পারেন, তাহলে মাসে ২৫–৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তাহলে সেই শ্রমিক কেন কারখানায় আট থেকে দশ ঘণ্টা পরিশ্রম করে তুলনামূলক কম আয়ে কাজ করবেন?
এখানেই আমাদের শ্রমবাজারের একটি বড় পরিবর্তন তৈরি হচ্ছে। এটা শুধু শ্রমিকের সমস্যা নয়; এটি শ্রমের মূল্য, উৎপাদনশীলতা এবং দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়। একজন শ্রমিক যেখানে নিজের শ্রম দিয়ে দ্রুত বেশি আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন, স্বাভাবিকভাবেই তিনি সেই পথটিই বেছে নেবেন। তাই শ্রমিক সংকটকে শুধু শ্রমিকের অনীহা হিসেবে দেখলে সমস্যাটির মূল কারণটি আমরা বুঝতে পারব না।
ঢাকার কোনো একটি ব্যস্ত সড়কে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই বিষয়টি বোঝা যায়। অনেক সময় মনে হয়, রাস্তায় চলাচলকারী মানুষের সংখ্যার তুলনায় টেসলা বা ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সংখ্যাই বেশি। প্রশ্ন হচ্ছে এই বিপুল সংখ্যক চালক আগে কী করতেন? তাদের অনেকেই কোনো না কোনো সময় শ্রমবাজারের অংশ ছিলেন। কেউ হয়তো কারখানায় কাজ করতেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক ছিলেন, আবার কেউ অন্য কোনো উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন।
অর্থাৎ একজন শ্রমিক যখন উৎপাদন খাত থেকে বেরিয়ে অপেক্ষাকৃত সহজে আয় করা যায় এমন অনানুষ্ঠানিক পরিবহন খাতে চলে যাচ্ছেন, তখন শুধু একটি চাকরি বদল হচ্ছে না। দেশের উৎপাদন ব্যবস্থার একটি অংশও ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে। একজন মানুষ হয়তো নিজের জন্য ভালো একটি আয়ের পথ বেছে নিচ্ছেন, কিন্তু একই সময়ে একটি কারখানা একজন কর্মী হারাচ্ছে। এমন ঘটনা যখন হাজার হাজার মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে, তখন সেটি আর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
শুধু শহরের ক্ষুদ্র শিল্প নয়, গ্রামের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ধান কাটা, ধান মাড়াই, কাঠের কাজ, নির্মাণকাজ কিংবা কৃষির বিভিন্ন মৌসুমি কাজে এখন শ্রমিক পাওয়া অনেক জায়গাতেই কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ১,০০০–১,৫০০ টাকা মজুরি দেওয়ার পরও প্রয়োজনের সময় শ্রমিক পাওয়া যায় না। অথচ কয়েক বছর আগেও গ্রামের অনেক কাজের জন্য সহজেই শ্রমিক পাওয়া যেত। এই পরিবর্তন আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্যও একটি বড় সতর্ক সংকেত।
কারণ একটি দেশের অর্থনীতি শুধু বড় শিল্প বা বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। গ্রামের কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর, শ্রমিক এবং ছোট কারখানাগুলোও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব খাতে যদি ধারাবাহিকভাবে শ্রমিকের সংকট তৈরি হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, খরচ বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপরও পড়বে।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার ব্যাটারিচালিত যানবাহন বা টেসলা বন্ধ করে দেওয়াই সমাধান নয়। মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত কোনো পেশা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবসম্মতও নয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তারও কোনো সমাধান হতে পারে না। কোন এলাকায় কতগুলো যান চলবে, কোথায় চলবে, কী ধরনের লাইসেন্স থাকবে, চালকদের কী প্রশিক্ষণ লাগবে, রাস্তার ধারণক্ষমতা কতটুকু-এসব নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রয়োজন।

কারণ আজ যদি প্রতিটি মানুষ উৎপাদনশীল কাজ ছেড়ে শুধুমাত্র রাস্তার সহজ আয়ের দিকে চলে যায়, তাহলে আগামী দিনে কারখানা চালানোর জন্য মানুষ পাওয়া যাবে না। আর কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একজন মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। ক্ষতিগ্রস্ত হবে শ্রমিক, সরবরাহকারী, ব্যবসায়ী এবং পুরো অর্থনীতির একটি অংশ।
শ্রমিক সংকটকে শুধু “শ্রমিক কাজ করতে চায় না”এভাবে ব্যাখ্যা করলে সমস্যার সমাধান হবে না। আবার সবকিছুর দায় সরকারের ওপর চাপিয়েও বসে থাকলে হবে না। আমাদের দেখতে হবে, কোন খাতে শ্রমিক চলে যাচ্ছে, কেন তারা উৎপাদনশীল কাজ ছেড়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছে, কারখানায় কাজ করলে তাদের প্রকৃত আয় ও সুযোগ-সুবিধা কত এবং পরিবহন খাতে আয়ের সুযোগ কেন বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্প কীভাবে দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখতে পারে এবং হকার ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের কীভাবে উৎপাদনশীল খাতে আনা যায়-এসব প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ একজন মানুষ কোথায় কাজ করবে, সেটা শুধু তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; অর্থনীতির কাঠামোও সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশ এখন এমন একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যখন একদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প শ্রমিক সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে শহর ও গ্রামে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের বিস্তার ঘটছে। মানুষ যেখানে বেশি আয়, কম ঝুঁকি এবং দ্রুত টাকা পাওয়ার সুযোগ দেখবে, সেখানেই যাবে। এটাই স্বাভাবিক। তাই মানুষকে দোষ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন সঠিক শ্রমনীতি, ক্ষুদ্র শিল্পবান্ধব পরিবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন, ন্যায্য মজুরি এবং অনানুষ্ঠানিক পরিবহন খাতের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। টেসলা চালানো মানুষটি আমাদের শত্রু নয়। হকারও শত্রু নয়। শ্রমিকও শত্রু নয়। সমস্যা হলো-আমরা আমাদের শ্রমশক্তিকে কোন খাতে ব্যবহার করছি এবং সেই শ্রমশক্তি দেশের উৎপাদন ও অর্থনীতিতে কতটা মূল্য তৈরি করছে।
আজ যদি বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ভাবা না হয়, তাহলে আগামী দিনে হয়তো আমাদের কারখানা থাকবে, অর্ডার থাকবে, বিনিয়োগ থাকবে-কিন্তু কাজ করানোর মতো শ্রমিক থাকবে না। আর তখন শ্রমিক সংকট আর শুধু কারখানার সমস্যা থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সংকট।