
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৪৯

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়কে এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময়জুড়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুই নারী নেত্রী , শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া। একদিকে আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে বিএনপি, এই দুই দল এবং তাদের দুই নেত্রীর নেতৃত্বই মূলত বাংলাদেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে এই সময়কে অনেকেই যথার্থভাবেই ‘দুই নেত্রীর যুগ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতায় বড় ধরনের ছেদ টেনেছে। গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং ভারতে আশ্রয় নেওয়া শুধু একটি সরকারের পতন নয়, বরং একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসানও বটে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসন করা দলটির প্রত্যাবর্তনের পথ আপাতত রুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশের রাজনীতিকে আরও একটি শূন্যতার মুখে দাঁড় করিয়েছে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই নেত্রীর বিদায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক যুগের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। তারেক রহমান এখন বিএনপির নেতৃত্বে থাকলেও, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উপস্থিতি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব এক ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছিল, যা আর ফিরে আসবে না।
এই দুই বাস্তবতার ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীনেতৃত্বের দীর্ঘ অধ্যায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। আগামী নির্বাচনের ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রধান শক্তিগুলোর শীর্ষ পদে এখন আর কোনো নারী নেতৃত্ব নেই। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট থেকেও পুরুষ নেতৃত্বই সামনে আসবে বলে প্রায় নিশ্চিত। অর্থাৎ ৩৬ বছর পর বাংলাদেশ আবার পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে।
এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। কারণ ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার পালাবদলেই দেশের রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্ব শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তও ছিল এই বাস্তবতা।

তবে প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি কেবল নেতৃত্বের লিঙ্গ পরিবর্তন, নাকি রাজনীতির কাঠামোগত রূপান্তর? শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি ও খালেদা জিয়ার মৃত্যু দেশের রাজনীতিকে নতুন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু গণতন্ত্রের মান, নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নগুলো এখনো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে এখন প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই গণতান্ত্রিক ভূমিকা পালন করবে। নেতৃত্ব পুরুষ বা নারী যেই হোক না কেন, জনগণের প্রত্যাশা থাকবে সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
সবশেষে বলা যায়, ‘দুই নেত্রীর যুগ’ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক দীর্ঘ স্মৃতিময় অধ্যায়। কিন্তু যুগের পরিবর্তন মানেই কেবল ব্যক্তি পরিবর্তন নয় এটি একটি নতুন রাজনৈতিক চর্চার সূচনা হতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে নেতৃত্বের পাশাপাশি গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও নতুন করে নির্ধারিত হবে।