
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:২৮

সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়ে গতকাল থেকে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অভিযোগে নিয়োগ-বাণিজ্য, পদায়ন এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের মতো বিষয় উঠে এসেছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে। তবে অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা সমীচীন নয়।
তবে এই অভিযোগ সামনে আসার পর দুর্নীতির পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। বিশেষ করে, যদি কোটি কোটি টাকা দিয়ে সরকারি পদায়ন বা নিয়োগ নেওয়ার ঘটনা সত্য হয়ে থাকে, তাহলে শুধু টাকা গ্রহণকারীর বিরুদ্ধে তদন্ত করলেই কি পুরো দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসবে?
ধরা যাক, কোনো একজন কর্মকর্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের জন্য ১০ কোটি, ১২ কোটি কিংবা ১৬ কোটি টাকা দিয়েছেন তাহলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, ওই কর্মকর্তা এত টাকা পেলেন কোথায়? তাঁর বৈধ আয় কত, সম্পদের পরিমাণ কত এবং সেই সম্পদের সঙ্গে তাঁর আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
একজন সরকারি কর্মকর্তার পদায়ন যদি অর্থের বিনিময়ে হয়ে থাকে বলে অভিযোগ ওঠে, তাহলে যিনি অর্থ গ্রহণ করেছেন তাঁর পাশাপাশি যিনি অর্থ দিয়েছেন, তাঁর ভূমিকাও তদন্ত করা জরুরি। কারণ ঘুষের লেনদেনে অর্থ গ্রহণকারী যেমন গুরুত্বপূর্ণ, অর্থ প্রদানকারীর ভূমিকাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ।
এখানেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের প্রচলিত তদন্ত ব্যবস্থার একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে। কোনো দুর্নীতির ঘটনায় সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রে থাকে টাকা গ্রহণকারী ব্যক্তি। কিন্তু সেই টাকা কোথা থেকে এসেছে, কে দিয়েছে, কেন দিয়েছে এবং এর বিনিময়ে কী সুবিধা নেওয়া হয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তরও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে বিষয়টি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। মামলা, গ্রেপ্তার, সম্পদ অনুসন্ধানসহ বিভিন্ন পদক্ষেপও দেখা যায়। কিন্তু কোনো দুর্নীতির সঙ্গে প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা আমলার সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে তাঁদের ভূমিকা কতটা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়, সেটিও জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
বিশেষ করে পদায়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। যাঁরা পদায়নের জন্য অর্থ দিয়েছেন, তাঁদের সম্পদের উৎস এবং আর্থিক লেনদেনও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, মধ্যস্থতাকারী এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা দরকার।
এখানে দুর্নীতি দমন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সত্য কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে তদন্তে যদি অন্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাঁদের বিরুদ্ধেও একইভাবে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
দুদকের তদন্তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত নিরপেক্ষতা। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক পদ, ব্যবসায়িক প্রভাব কিংবা অন্য কোনো ধরনের ক্ষমতা যেন তদন্তের পথে বাধা না হয়। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি যেমন আইনের ঊর্ধ্বে নন, তেমনি একজন সরকারি কর্মকর্তাও আইনের ঊর্ধ্বে নন।

আমরা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে সত্য বলে ধরে নিচ্ছি না। আবার অভিযোগটি মিথ্যা এমন দাবিও করছি না। আমাদের বক্তব্য হলো, অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া উচিত। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
কারণ ১১ হাজার কোটি টাকার মতো বিপুল অর্থের অভিযোগ সত্য হলে সেটি কোনো এক ব্যক্তির একক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। এর সঙ্গে অর্থের উৎস, অর্থ প্রদানকারী, অর্থ গ্রহণকারী, মধ্যস্থতাকারী, সুবিধাভোগী এবং অর্থের গন্তব্য—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে শুধু ‘কে টাকা নিয়েছে’ এই প্রশ্নে তদন্ত সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। একই সঙ্গে জানতে হবে, কে টাকা দিয়েছে, সেই টাকা কোথা থেকে এসেছে এবং এর বিনিময়ে কী সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
একই আইনের প্রয়োগ সবার জন্য নিশ্চিত করা না গেলে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিয়ে মানুষের আস্থা তৈরি হবে না। রাজনৈতিক ব্যক্তি, আমলা, ব্যবসায়ী কিংবা অন্য যে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি অভিযোগের ভিত্তি ও প্রমাণ থাকলে প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই একই ধরনের তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
১১ হাজার কোটি টাকার অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই বেরিয়ে আসুক। তবে তদন্ত যেন শুধু একজনকে ঘিরে না থাকে; অভিযোগের পেছনে যদি কোনো বৃহত্তর দুর্নীতির নেটওয়ার্ক থেকে থাকে, সেটিও যেন তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
এটাই হওয়া উচিত একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য।