
প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ২১:৫৯

বিশ্ব রাজনীতিতে বন্ধু কিংবা প্রতিপক্ষ এই পরিচয়গুলো সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। কিন্তু একটি বিষয় কখনো বদলায় না, সেটি হলো অর্থনৈতিক স্বার্থ। আধুনিক বিশ্বে যে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার প্রভাবও তত বেশি। ফলে আদর্শিক মতভেদ থাকলেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশগুলোকে একে অপরের সঙ্গে কাজ করতেই হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে ঘিরে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টিকে রাজনৈতিক আবেগ কিংবা পক্ষ-বিপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করা জরুরি। যেকোনো আন্তর্জাতিক উদ্যোগে অংশ নেওয়ার আগে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতি, নিরাপত্তা এবং কৌশলগত অবস্থানই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
তবে একটি বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। মিয়ানমারের সঙ্গে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সহযোগিতার আগে রোহিঙ্গা সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করার প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলতে হবে। বছরের পর বছর ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দায়ভার বহন করছে বাংলাদেশ। তাই মানবিক সংকটের সমাধান ছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক পর্যায়ে নেওয়া সহজ হবে না।
অন্যদিকে, এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। দেশের সমুদ্রবন্দর, সড়ক ও রেল অবকাঠামো আরও উন্নত হবে। ট্রানজিট সুবিধা থেকে রাজস্ব আয় বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই শিল্প, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং আমদানি-রপ্তানিতে দুই দেশের সহযোগিতা রয়েছে। সেই সম্পর্ককে আরও কার্যকর ও লাভজনক রূপ দেওয়া রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, যদি প্রতিটি চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

একই সময়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত কিংবা অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, অর্থনৈতিক সুবিধা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ভবিষ্যতে কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভারতকে নিয়েও অযথা আবেগ সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই। প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে যেমন সহযোগিতা দরকার, তেমনি চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও প্রয়োজনভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলা বাংলাদেশের অধিকার। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, বরং স্বার্থ সংরক্ষণের শিল্প।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এমন হওয়া উচিত, যেখানে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা, স্লোগানের চেয়ে উন্নয়ন এবং সাময়িক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ ইতিহাস বলে, সফল রাষ্ট্রগুলো আবেগ দিয়ে নয়, বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা এবং কৌশলগত ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়েই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে।