
প্রকাশ: ৩ আগস্ট ২০২২, ০:২৪

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে জেলা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও থানা পুলিশ বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করলেও বন্ধ হচ্ছে না মাদক ব্যবসা। ভারত থেকে পানির স্রোতের মতো আসছে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। এতে ধ্বংস হচ্ছে যুবসমাজ।
ভূরুঙ্গামারী উপজেলার তিন দিকে ভারতীয় সীমান্ত থাকায় সীমান্ত গলিয়ে অবাধে মদ, গাঁজা, হেরোইন ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক আসছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মাদক কেনাবেচা হচ্ছে। ঘরে বসে অর্ডার দিলেই মিলছে মাদক। মাদকের এমন ভয়াবহ বিস্তারে ভূরুঙ্গামারী এখন মাদকের স্বর্গরাজ্য। স্কুল-কলেজের ছাত্রসহ বিভিন্ন শ্রেনি পেশার মানুষ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন মাদকাসক্তের অভিভাবকরা।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসার সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জড়িত। সেকারণে এলাকার সাধারণ মানুষ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশের অভিযানে কতিপয় মাদককারবারি আটক হলেও চিহ্নিত বড়বড় মাদক ব্যবসায়ীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
কুড়িগ্রাম মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানাগেছে, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ভূরুঙ্গামারীতে অভিযান চালিয়ে ১১ জন মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়েছে। এসময় তাদের নিকট থেকে ৫৫ বোতল মদ, ১৪ বোতল ফেন্সিডিল, ৬ কেজি ১৫০ গ্রাম গাঁজা, ২ গ্রাম হেরোইন, ২ পিস ইয়াবা সহ নগদ ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮২০ টাকা জব্দ করা হয়েছে।

ভূরুঙ্গামারী থানা পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাই মাসে ৯০ পিস ইয়াবা, ২ গ্রাম হিরোইন ও ১ কেজি ৬০০ গ্রাম গাঁজা সহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। মাদক উদ্ধারের ঘটনায় বিজিবি দু’টি ও পুলিশ দু’টি মামলা দায়ের করেছে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রে জানাগেছে, ভারত থেকে ভূরুঙ্গামারীতে মাদক আনার ক্ষেত্রে দুই দেশের শতাধিক চোরাকারবারী সক্রিয় রয়েছেন। তারা আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য ও কতিপয় রাজনৈতিক নেতার যোগসাজসে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। মাদক ব্যবসায়ীরা ভূরুঙ্গামারীকে কয়েকটি রুটে ভাগ করে নিরাপদে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। শিংঝাড় থেকে মানিককাজি হয়ে বাগভান্ডার ও ছোটখাটামারি ফেনসিডিল রুট।

মানিককাজি, পাথরডুবি ও বাশঁজানি হয়ে দিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত গাঁজার রুট। শালঝোড়, কাজিয়ারচর, ধলডাঙ্গা, পাগলারহাট ও উত্তর তিলাই মদের রুট। চরভূরুঙ্গামারী হয়ে সোনাহাট স্থলবন্দর দিয়ে আসে হেরোইন ও ইয়াবার চালান। সীমান্ত পেরিয়ে সড়ক পথে আসা এসব মাদক পরে বাস, মাইক্রোবাস, ট্রাক, ভ্যান ও লরিতে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, উপজেলার দশ ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশত স্পটে মাদক ব্যবসা চলে। সন্ধ্যার পর এসব স্পটে মাদকের ভাসমান হাট বসে। স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে জয়মনিরহাট ইউনিয়নের শিংঝাড় লালব্রিজের পাড় ও পুরাতন রেললাইনের দুপাড়, ভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নের সোনাতলী, মানিককাজি ঘাট, লাকি সিনেমা হল পাড়া, গার্লস্কুল পূর্বমোড়, পাথরডুবী ইউনিয়নের বাঁশজানি ও দিয়াডাঙ্গা, চরভূরুঙ্গামারী ইউনিয়নের নতুনহাট বাজার ও বাবুরহাট বাজার, তিলাই ইউনিয়নের খোচাবাড়ির চর ও দক্ষিন তিলাই ঢাকাইয়া পাড়া, পাইকেড়ছড়া ইউনিয়নের পাটেশ্বরী ও ফুটানীবাজার। এছাড়া শিলখুড়ি ও সোনাহাট ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকাসহ উপজেলার প্রায় অধিকাংশ এলাকাতেই মাদকের ব্যবসা চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূরুঙ্গামারী সরকারি কলেজ পাড়ার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, আমাদের বাড়ির পাশেই দিনরাত মাদক কেনাবেচা ও সেবনের আসর বসে। মাদকের গন্ধে বাড়িতে থাকা যায় না। পুলিশের কাছে অভিযোগ করে পরিচয় প্রকাশ হয়ে গেলে মাদকসেবীদের হাতে লাঞ্ছিত হতে হবে এই ভয়ে পুলিশকে কিছু জানাতে পারছিনা।
ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আলমগীর হোসেন বলেন, মাদকের বিষয়ে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রয়েছে। মাদকাসক্ত হয়ে যুবসমাজ ধ্বংস হোক এটা আমরা চাইনা। মাদকের সাথে আপোষ নয়। মাদক ব্যবসায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।
মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কুড়িগ্রামের সহকারী পরিচালক আবু জাফর বলেন, মাদক নির্মূলে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া জনসচেতনতা বাড়াতে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জেলা জুড়ে বিভিন্ন কর্মশালা পালন করছে। মাদকের সাথে যত বড় নেতাই জড়িত থাকুক তাকে ছাড় দেয়া হবে না।