সম্পত্তির লোভে ৮ বছর শিকলবন্দী, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
জেলা প্রতিনিধি, বরিশাল।
প্রকাশিত: বৃহঃস্পতিবার ২০শে জানুয়ারী ২০২২ ০৬:০২ অপরাহ্ন
সম্পত্তির লোভে ৮ বছর শিকলবন্দী, তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল

বরিশালের আগৈলঝাড়ায় বড় ভাইকে প্রতিবন্ধী সাজিয়ে ৮ বছর শিকলেবন্দী করে রেখেছেন আপন ছোট ভাই এমন একটি প্রতিবেদন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশের পরে ভুক্তভোগীর পক্ষে সরজমিনে তদন্তে নামে উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল। তদন্ত শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর। তদন্ত প্রতিবেদনে সন্তোষ প্রকাশসহ গভীরভাবে তদন্ত করাসহ আইনী ব্যবস্থা নেওয়া এবং সুচিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। অন্যদিকে শিকলবন্দী করে রাখার পিছনে অসৎ উদ্দ্যেশ রয়েছে কিনা তা গভীরভাবে তদন্ত করে দেখবেন বলে জানান উপজেলা প্রশাসন।


রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের মৃত আলতাফ হোসেনের ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন তোতা মিয়াকে ছোট একটি ঘরে দীর্ঘ ৮ বছর শিকলবন্দী করে রাখে তার ছোট ভাই। এমনই একটি সংবাদ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশের পরে নরেচরে বসে উপজেলা প্রশাসন। ২০ই ডিসেম্বর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জাহাঙ্গীর হোসেন তোতা মিয়াকে শিকলবন্দী থেকে মুক্ত করেন সমাজসেবা কর্মকর্তা সুশান্ত বালা।


সমাজসেবা কর্মকর্তা সুশান্ত বালা জানান, তদন্ত করে রিপোর্টে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়।


প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পরে তোতা মিয়াকে ছোট একটি ঘর থেকে শিকলবন্দী থেকে মুক্ত করে ছোট ভাইয়ের ভবনে রাখা হয় এবং তাদের দেখে তখন স্বাভাবিক ভাবে রুম থেকে বেড় হয়ে কথা বলে তোতা মিয়া। তাকে আট বছর থেকে কোন ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই দুইটি ঔষধ খাওয়ানো হতো এবং তোতা মিয়ার স্ত্রীকে ছোট ভাই মানিক মিয়াসহ পরিবারের অন্যান্যরা অত্যাচার করে সংসার ছাড়তে বাধ্য করে। এমনকি তার স্ত্রীর গর্ভে একটি বাচ্চা এসেছিল যা তার ছোট ভাই রাংতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মানিক মিয়ার অত্যাচারে নষ্ট করতে বাধ্য হয়েছেন। 


এমনকি তোতা মিয়াকে র্দীর্ঘদিন একটি ঘরে শিকলবন্দী করে রাখার পিছনে অসৎ উদ্দেশ্য বা অন্য কোন কারন রয়েছে কিনা তা গভীরভাবে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন এবং সুস্থ্য সুন্দর ও শিকল মুক্ত স্বাভাবিক জীবন যাপনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে প্রতিবেদন দেন।


স্থানীয় কামরুজ্জামান সবুজ বলেন, ছোট ভাই শিক্ষক মানিক মিয়া ইচ্ছেকৃত ভাবে তার আপন বড় ভাইকে ৮ বছর ধরে শিকলেবন্দী করে একটি টিনের ধানের গোলা ঘরে রেখেছিলেন। যেখানে ছিলোনা কোন বিদ্যুৎ, কোন দিন খাবার পেত আবার কোন দিন না খেয়ে থাকতে হতো তাকে। এভাবেই শিকল পায়ে ৮ বছর থেকে বন্দী জীবন পার করছেন জাহাঙ্গীর হোসেন তোতা।


স্থানীয় ফারুক হাওলাদার জানান, তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর হোসেন তোতা। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা তিতুমীর কলেজে পড়াশুনা করতেন তিনি।


স্থানীয় দুলাল মাতুব্বর জানান, রাংতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছোট ভাই মানিক মিয়া শিক্ষক হলেও আট বছর থেকে বড় ভাইকে দিচ্ছিলনা কোন চিকিৎসা সেবা। নিজে থাকার জন্য পাকা ভবন নির্মাণ করলেও বড় ভাইকে রেখেছিল ধানের একটি গোলা ঘরে। তোতা মিয়া সুস্থ থাকার পরেও রাখা হয়েছিল শিকলেবন্দী।


আরেক প্রতিবেশী হাবিব মল্লিক জানান, শিকলেবন্দী থেকে তোতা মিয়াকে মুক্ত করার জন্য প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান এবং তার সুচিকিৎসার জন্য প্রশাসনের সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন।


রাংতা ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন জানান, ছোট ভাই শিক্ষক মানিক মিয়ার অবহেলার কারনেই দীর্ঘ ৮ বছর ধরে জাহাঙ্গীর হোসেন তোতা শিকলবন্দী ছিলো। ছোট ভাই মানিক মিয়াকে আইনের আওতায় এনে তোতা মিয়াকে সুচিকিৎসার ব্যবস্থাসহ সুস্থ্য সুন্দর শিকল মুক্ত স্বাভাবিক জীবনের ব্যবস্থা করার দাবী জানান উপজেলা প্রশাসনের কাছে।


জাহাঙ্গীর হোসেন তোতার একমাত্র ছোট ভাই রাংতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মানিক মিয়া জানান, আমার বড় ভাই মানসিক সমস্যা নিয়ে অসুস্থ ছিল। তাকে মানসিক সমস্যার কারনেই শিকলবন্দী করে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে তোতা মিয়ার সু-চিকিৎসার সকল ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।


উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা সুশান্ত বালা আরও জানান, আমরা এই ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি। অচিরেই এব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শেখর রঞ্জন ভক্ত জানান, রাংতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মানিক মিয়া তার ভাই তোতা মিয়াকে শিকলেবন্দী রাখার ব্যাপারে তার সম্পৃক্ততা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।


এব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবুল হাশেম জানান, তদন্ত প্রতিবেদন জমা পেয়েছি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুব দ্রুতই ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।