
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, ২০:১৯

মৌলভীবাজারের জুড়ীতে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে শিক্ষার পথে এগিয়ে চলেছেন মনা বেগম। জন্ম থেকেই বাঁ হাত ও বাঁ পায়ে শক্তি না থাকলেও থেমে যাননি তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে এইচএসসি পাস করেছেন মনা। এখন তার স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া।
মনা জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের রত্না চা-বাগানের ফাঁড়ি এলাপুর গ্রামের দিনমজুর হারিছ আলী ও আমিনা বেগমের মেয়ে। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা মনার চলাফেরার জন্য অন্যের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। তবুও পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ তাকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
শৈশব থেকেই মনার শিক্ষাজীবন ছিল নানা চ্যালেঞ্জে ভরা। নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারায় হাতের ওপর ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কলেজে যেতেন তিনি। কখনো মায়ের কোলে, কখনো নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছেছেন। মানুষের নানা কটূক্তিও তার পড়াশোনার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
শামস উদ্দিন আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং শাহ নিমাত্রা সাগরনাল-ফুলতলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন মনা। সর্বশেষ এইচএসসি পরীক্ষায় তিনি জিপিএ ২.৫০ পেয়েছেন। এখন ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
মনা বলেন, শারীরিক কষ্টের কারণে অনেক সময় পথ চলতে খুব কষ্ট হয়। হামাগুড়ি দিয়ে চলার সময় কেউ কেউ হাসাহাসি করে, এমনকি ভিডিও ধারণ করে। এসব ঘটনায় কষ্ট পেলেও তিনি হাল ছাড়তে চান না। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করে বাবা-মায়ের কষ্ট দূর করাই তার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।

মনার মা আমিনা বেগম জানান, মেয়েকে কখনো প্রতিবন্ধী হিসেবে আলাদা করে দেখেননি। অন্য সন্তানদের মতো করেই তাকে বড় করেছেন। নিজের কোলে করে স্কুল ও কলেজে নিয়ে গেছেন। কিন্তু স্বামীর সামান্য আয়ে সংসার চালানোই কঠিন হওয়ায় মেয়ের উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
মনা বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা হিসেবে মাসে ৮৫০ টাকা পান, যা তিন মাস পরপর দেওয়া হয়। তবে নিয়মিত যাতায়াত, বইপত্র, চিকিৎসা ও অন্যান্য শিক্ষা ব্যয় মেটাতে এই অর্থ যথেষ্ট নয়। মনার পরিবার তার চলাচলের কষ্ট কমাতে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা বা উপযুক্ত বাহন এবং শিক্ষার জন্য নিয়মিত আর্থিক সহায়তা কামনা করছে।
মনার শিক্ষক ও স্থানীয়রা জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার মেধা ও ইচ্ছাশক্তিকে কখনো পরাজিত করতে পারেনি। কলেজের অধ্যক্ষ জহির উদ্দিনও তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহের প্রশংসা করেছেন। ইতোমধ্যে জুড়ী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে শুভেচ্ছা উপহার দেওয়া হয়েছে। এখন মনার স্বপ্ন পূরণে সরকারি সহায়তা ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে তার উচ্চশিক্ষার পথ আরও সহজ হবে।