
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২২, ২০:৪৮

দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বোরহান উদ্দিন একাই একশো। এবারের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ ২০২২ দিবসে অনুপস্থিত সহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। মাসে-ছ'মাসেও অফিসে উপস্থিত থাকেন না তিনি। পিয়ন ও অফিসের হিসাব রক্ষক দ্বারাই অফিসের সকল কাজ করে নিতে হয়, এমনটিই অভিযোগ ভুক্তভোগী শিক্ষকদের। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট একাধিক অভিযোগ করেও কোন লাভ হয়নি, বলছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ নূর- এ আলম।
জানা যায়, গত শনিবার সারাদেশের ন্যায় হাকিমপুর উপজেলাতেও পালিত হয়েছে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০২২। উক্ত দিবসের আয়োজক হয়ে থাকে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার। কিন্তু হাকিমপুর উপজেলায় এই আয়োজক শিক্ষা অফিসার বোরহান উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন না। তিনি না থাকায় ব্যাহত হয় জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের সকল কার্যক্রম। এছাড়াও পরের দিন (রবিবার থেকে আজ মঙ্গলবার) পর্যন্ত অফিসে উপস্থিত হননি তিনি।
২০১৭ সালে হাকিমপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করেন এই অফিসার বোরহান উদ্দিন। যোগদানের পর থেকেই এ্যালোমেলো ভাবে অফিস করা এবং অধিকাংশ সময় অনুপস্থিত থাকেন এই শিক্ষা অফিসার। দিনের পর পর দিন ধর্ণা দিয়েও শিক্ষকদের মেলে না তার দেখা। পিয়ন আর অফিস সহকারীরাই করে থাকেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সকল কাজ। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ে বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসার নিয়োগ সংক্রান্ত (নিয়োগ বোর্ড) এর সময়ে তার ব্যক্তিগত চাহিদা মিটালে নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত থাকেন এই বোরহান উদ্দিন।
আরও জানা যায়, এর আগেও একাধিক বার তার অনিয়ম-দুর্নীতি বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও কোন সুরাহা পায়নি ভুক্তভোগীরা। খেয়াল-খুশি মতোই চলে আসছে তার চলাফেরা। তার এমন চলাফেরায় অনেকেই মনে করেন তিনি একাই একশো।
কোনো ট্যাগ পাওয়া যায়নি

ভুক্তভোগী বাংলাহিলি পাইলট স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন, উনি তো একজন টাউট শিক্ষা অফিসার, উনার অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। মাসে একদিনও ঠিক মতো অফিস করেন না। পিয়ন আর অফিসের হিসাব রক্ষক দ্বারা সকল কাজ করে নিতে হয়। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ এমন গুরুত্বপূর্ণ দিবসেও তিনি উপস্থিত থাকে না?
ছাতনী রাউতারা জি এম ফাজিল মাদ্রাসা প্রিন্সিপাল নুরুল ইসলাম বলেন, উনার অনেক সমস্যা সবাই তা জানে, কেউ ভয়ে মুখ খুলে না। অফিসে গেলে তার দেখা কমি মেলে। কারণ আমার জানা মতে উনি ঢাকায় অবস্থান করেন। যে কারনে শুধু মাত্র মাধ্যমিক পর্যায়ে স্কুল ও মাদ্রাসার নিয়োগ বোর্ডের বিষয়ে তাকে অবগত করলে এবং তার নিজ চাহিদা মিটালে উনি বিমান যোগে সৈয়দপুর আসেন এবং সেখান থেকে প্রাইভেট কারে নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত হন। এরপর আবারও ঢাকায় চলে যান।
উপজেলার গোহাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তোফাজ্জল হোসেনে বলেন, আমাদের উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নিয়মিত অফিস না করায় অনেক কাজে ভোগান্তি পোহাতে হয়। কারণ কোন কাজে তার অফিসে গেলে পাওয়া যায় না। মোবাইলে কথা বললে তিনি বলেন আমার অফিসের নৈশপ্রহরী আব্দুল মাজেদ মিয়ার সাথে কথা বলেন। এটা আমাদের জন্য অত্যান্ত দুঃখ জনক বিষয়! উপজেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীদের নতুন বেতন, টাইম স্কেল কাজ করতে গেলেও তার অফিসের নৈশপ্রহরী (নাইটগার্ড) আব্দুল মাজেদ মিয়ার সাথে কথা বলে তারপরে নিজেদের কাজ করে নিতে হয়। তবে সব মিলিয়ে ওনাকে এখান থেকে অন্যত্র বদলি করা হলে আমাদের জন্য খুবই ভালো হয়।

হাকিমপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের হিসাব রক্ষক আশরাফুল আলম বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের বিষয়ে গোটা হাকিমপুর উপজেলার মানুষ জানেন, আমি আর কি বলবো? উনি অফিস ঠিক মতো করেন না। এছাড়াও গত জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহেও উপস্থিত ছিলেন না। এবিষয়ে তার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে আমাকে অপমান-অপদস্থ হতে হয়েছে।অফিস সহায়ক শফিকুল ইসলাম বলেন, আমি ছোট কর্মচারী, উনার বিষয়ে কিছু বললে আমার অসুবিধা হবে।
মঙ্গলবার (২৪ মে) দুপুর ১২ টায় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে তার অফিসে গেলে, দেখা যায় আজও তিনি অফিসে উপস্থিত হননি, চেয়ার রয়েছে ফাঁকা। তার ফোন নাম্বারে (01738-185434) যোগাযোগ করলে এসময় মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বোরহান উদ্দিন বলেন আমি মোটরসাইকেলে আছি, পরে কথা বলি। পরে একাধিক বার ফোন করলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেন না।
হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ নুর-এ-আলম বলেন, এর আগেও এই মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বোরহান উদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকি জেলা মাসিক মিটিং-এ রেজুলেশন এর মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপরও তার কোন পরিবর্তন আমি লক্ষ্য করতে পারি নাই। সম্প্রতি গত শনিবার জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২২ এই দিনেও উনি উপস্থিত ছিলেন না। আমি এবিষয়ে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ করেছি। তিনারা এবিষয়ে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহন করবেন বলে আশা করছি।
এবিষয়ে হাকিমপুর উপজেলা চেয়ারম্যান হারুন উর রশিদ হারুন ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, আমাদের ব্যর্থতা এমন অযোগ্য অফিসার আমাদের উপজেলায় আজও অবস্থান করছেন। বিগত দিনেও তার বিরুদ্ধ অনেক অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেও কোন লাভ হয়নি। অফিস না করেও একজন সরকারি কর্মকর্তা কিভাবে সরকারি বেতন ভতা পায় আমার বোধগম্য নয়।
মুঠোফোনে জানতে চাইলে দিনাজপুর জেলা শিক্ষা অফিসার রফিকুল ইসলম বলেন, শিক্ষা অফিসার বোরহান উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পেয়েছি। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট ইতিপূর্বেও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এবারও তার অফিস না করা এবং জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপস্থিত না থাকার অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি উপর মহলে জানানো হবে।