
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২১, ১৪:৫৯

জলবায়ুর পরিবর্তন এবং অব্যহত খোল পেটুয়া নদীর ভাঙ্গনের ফলে শতাধিক পরিবারের ১১টি পরিবার তার ৫৪ সদস্য নিয়ে আশাশুনির মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথে আশাশুনি সদরের দয়ারঘাট গ্রাম। ১৯৯৪ সাল থেকে খোলপেটুয়া অব্যহত ভাঙ্গনে গ্রামটির প্রায় ৪০০ বিঘা জমি,ঘর-বাড়ি, পুকুর ও ফসলের ক্ষেত নিচিহ্ন হতে চলছে।
প্রথম থেকেই নদী শাসন না করে পিছিয়ে রিংবাঁধ দিতে দিতে উক্ত ৪০০ বিঘা থেকে মাত্র ৯/১০ বিঘা জমি বাকী আছে। বিগত আম্ফানে একই গ্রামে ফের ৩ পয়েন্ট ভেঙ্গে প্লাবিত হওয়ায় আবার নতুন ওয়াপদা রাস্তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এবার রাস্তা উঠলে এই ১১ থেকেই আবার ৪ টি পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। দুঃখীরাম, হরিপদ বিশ্বাস, কমলা বেওয়া ও নিমাই ম-ল ভেঙ্গে যাওয়া ওয়াপদার স্লোপে বাস করেন। নতুন রাস্তা উঠলে এদের অন্যত্র যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
১৯৯৪-৯৫ সাল থেকেই নদী ভাঙ্গনে জমি দিতে দিতে তাদের কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি নদীতে বিসর্জন দিয়ে চলেছে। জন্মভিটা হারানো পরিবারগুলো হয় পার্শ্ববর্তী গ্রামে না হয় অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে ভারতে পাড়ি দিয়েছেন।
এখনও যারা পড়ে আছেন বাপ-দাদার ভিটা আঁকড়ে তারাও প্রতি বছর খোলপেটুয়া নদীর ভাঙ্গনে লোনা পানিতে হাবুডুবু খেয়ে চলেছেন। দয়ারঘাট গ্রামে এখনও টিকে থাকা পরিবার হলো মনিন্দ্র নাথ ম-ল, দুঃখীরাম ম-ল, হরিপদ বিশ্বাস, অজিত শীল, শ্বশ্মাণ শীল, নিমাই ম-ল, মণ্টু ম-ল, মদন ম-ল, গণেশ ম-ল, তারক ম-ল ও পঞ্চরাম ম-ল।

বাঁধ হলে নতুন করে ওয়াপদার স্লোপে চলে যাবেন মনিন্দ্র ম-ল, শ্বশ্মাণ শীল, তারক ম-ল ও মদন ম-ল। বাঁধ স্থায়ী না আশাশুনির মানচিত্রে হয়তো বা গ্রামটির নাম থাকবে থাকবে না কোন জনবসতি। নদী ভাঙ্গনের ফলে দয়ারঘাট গ্রাম থেকে অন্যত্র বসবাস করতে বাধ্য হয়েছেন রুপচাঁদ ম-ল ও দীপচাঁদ ম-ল, গুরুপদ ম-ল (জেলেখালী),
প্রতিবন্ধী বিশ্বনাথ ম-ল (ভারত), ভুচি বেওয়া, রনজিৎ সানা (ভারত), মনিন্দ্র সানা (আশাশুনি), কোমল সানা (পুঁটিমারী), সুকুমার সানা (আশাশুনি), বিমল সানা (বলাবাড়িয়া), ক্ষিতিষ সানা (আশাশুনি), বিধুরঞ্জন সানা (ভারত), বিশ্বনাথ সানা (আশাশুনি), সুদর্শন সানা (আশাশুনি)। এছাড়া জেলে পল্লীর ভূপতি ম-ল সাতক্ষীরা গেলেও মধু ম-ল, সন্ন্যাসী ম-ল, বিমল ম-ল, বিজয় ম-ল, মতিলাল ম-ল, হরি ম-ল, সাধু ম-ল, দুলাল ম-ল, তারা ম-লসহ আরও অনেকে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মনিন্দ্র সানা, বিভূতি ভূষণ রায়, রবিউল ইসলামসহ অনেকেই জানান- দয়ারঘাট থেকে জেলেখালী পর্যন্ত মাত্র ১১ চেইন রাস্তা সব সময়ই জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকে। এছাড়া জেলেখালী থেকে মানিকখালী ব্রীজ পর্যন্ত প্রায় দেড় কি.মি. ওয়াপদা রাস্তাাও সমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।

সরকার বরাদ্দ দেয় কিন্তু কাজ ঠিকমত হয়নি কোনদিন। ৬৫ বছরের পুরানো রাস্তা ভাঙ্গে, কর্তাব্যক্তিরা দেখে বরাদ্দ করেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতে আবার যা তাই অবস্থা। কারও কোন জবাবদিহিতা নেই। সর্বশেষ আম্পানে ভাঙ্গনের আগে থেকেই একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান প্রায় ২০ লক্ষ টাকার বরাদ্দ নিয়ে কাজ করছিলেন।
কাজ শেষ করার সময় পার হয়ে যাওয়ার পরও অজ্ঞাত কারণে নির্মাকাজ দ্রুত শেষ করা হয়নি। যেদিন ভাঙ্গে তার এক সপ্তাহ আগে সংস্কার কার্যক্রম চলা রাস্তার উপর প্রায় ২ হাজার বালু বোঝাই জিও ব্যাগ ভরা ছিল কিন্তু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, উপজেলা প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধি কেউই সেগুলির ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখানকার ৩ টি পয়েন্ট ভেঙ্গে যায়।
পিচের রাস্তার উপর দিয়ে রিংবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি আটকানো হলেও অদ্যবধি ৩ শতাধিক বিঘা জমিতে জোয়ার-ভাটা চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বলে চলেছেন বরাদ্দ হয়েছে,অচিরেই কাজ শুরু হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোন কাজ শুরু হয়নি।
আশাশুনিসহ দক্ষিনের উপজেলাগুলির যাবতীয় উন্নয়ন নির্ভর করে নদীর শক্তপোক্ত বেড়িবাঁধের উপর। রাস্তাঘাট,বনায়ন যাই করেন না কেন বেড়িবাঁধ যদি ভাঙ্গতে থাকে তবে সব উন্নয়নই ভেসে যাবে। উন্নয়ন অব্যহত রাখতে আশশুনি উপজেলাবাসীর ‘দাবী একটাই বাঁচতে হলে টেঁকসই বেড়িবাঁধ চাই’।