হাইব্রিড ও উচ্চফলনশীল ধানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মৌলভীবাজার জেলায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় অসংখ্য জাতের বহুমাত্রিক ধান। এক সময় জেলার গ্রামাঞ্চলে দেশি ও স্থানীয় বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ধানের ব্যাপক চাষাবাদ হলেও বর্তমানে আমন, বোরো ও আউশ মৌসুমে এসব ধানের চাষ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তিন দশক আগেও জেলায় প্রায় সত্তর প্রজাতির স্থানীয় ধানের চাষ হতো। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ প্রজাতিতে। খাদ্যের বাড়তি চাহিদা, কৃষিজমি কমে যাওয়া, জমির উর্বরতা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক লাভের হিসাব কৃষকদের উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ধান চাষে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে।
এক সময় আউশ, রোপা আমন ও বোনা আমন মৌসুমে কাসালাথ, আড়াই, চেংড়ি, বাউরস, নাজিমুদ্দিন, লাঠিশাইল, বালাম, ভুতুবালাম, মুরালী, কাতিছিনি, নিহি, খৈসা, পশুআইল, ছিরমইন, পাখবিরনী ও দুধকাতারীসহ বহু ঐতিহ্যবাহী ধানের চাষ হতো। বাউরস ও চেংড়ি ধান দেশের আবহাওয়ার সঙ্গে অত্যন্ত মানানসই ছিল। দুই ফুট পানিতে নিমজ্জিত জমিতেও এসব ধানের ভালো ফলন মিলত।
চেংড়ি ধানের ভাত ও চিড়া ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু। নাজিমুদ্দিন ধান ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, যা ঈদ, পূজা, বিয়ে ও নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে অপরিহার্য ছিল। কালো রঙের নিহি ধান পাকার সময় চারপাশে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। বালাম ও ভুতুবালাম ছিল লালচে, আর কাতিছিনি ছিল খয়েরি রঙের ধান। ছিরমইন ধান প্রায় পনেরো ফুট পানিতেও উৎপাদনে সক্ষম ছিল।
বর্তমানে ধানবীজের বাজার ঘুরেও এসব জাতের বীজ পাওয়া যায় না। প্রবীণ কৃষকদের কাছে এসব ধান এখন শুধুই স্মৃতি। রাজনগরের প্রবীণ কৃষক মো. সুরুজ আলী জানান, আগে দেশীয় ধানে প্রতি একরে ৪০ থেকে ৪৫ মন ফলন হতো, আর এখন উচ্চফলনশীল ধানে ৯০ থেকে ১০০ মন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। একই জমিতে দ্বিগুণ উৎপাদন হওয়ায় কৃষকরা দেশীয় ধান ছেড়ে দিয়েছেন।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কৃষক জোনাব আলী বলেন, আগে হাওরে বিন্নি ও কালিজিরা ধানের চাষ বেশি হতো। এখন পারিবারিক প্রয়োজনে অল্প জমিতে এসব ধান হয়, বাকি জমিতে উচ্চফলনশীল ধান চাষ করতে হয়, নইলে খরচ ওঠে না।