
প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২২, ১:৩৫

নওগাঁয় উন্নত জাতের কাশ্মীরি ও বলসুন্দরী বরই চাষ করে সফলতা পেয়েছেন কৃষক লিটন হোসেন (৩৫)। লিটনের এই বাগানে বরইয়ের সফল চাষ হওয়ায় অনেকেই এখন বাগানটি দেখতে যাচ্ছেন। আগামীতে এই জাতের বরইগুলোর বাগান আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষক ও কৃষি অফিস।
বাগানের গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে সুস্বাধু মিষ্টি বরই। দেখতে লাল আপেলের মতো। স্থানীয়দের কাছে কাশ্মীরি বরইগুলো আপেল কুল, বল সুন্দরী, বাড়ি কুল ও টক-মিষ্টি হিসেবেও পরিচিত। রোগবালাই কম, অল্প খরচে মাত্র ১বছরের মধ্যেই কাশ্মীরি ও বলসুন্দরী বরই চাষে সফল হয়েছেন নওগাঁর সদর উপজেলার বর্ষাইল ইউনিয়ন এর মকমলপুর গ্রামের কৃষক লিটন হোসেন। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে চুয়াডাঙ্গা থেকে ৩০০ কাশ্মীরি ও ১২৫পিচ বলসুন্দরী জাতের চারা এনে ২বিঘা জমিতে রোপণ করেন তিনি। লিটনের অক্লান্ত পরিশ্রম ও পরিচর্যায় মাত্র ১১মাসের মাথায় সবকটি গাছেই থোকায় থোকায় বরই ধরেছে। বরই চাষে এক বছরেই পাল্টে দিয়েছে কৃষক লিটনের ভাগ্য। লিটনের এমন সফলতা দেখে এলাকার কৃষকরাও আগ্রহ দেখাচ্ছেল বরই চাষে। তারা বলছেন, যদি স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে পরামর্শ ও সহায়তা দেয়া হয়, তবে আগামীতে তারাও কাশ্মীরি ও বলসুন্দরী জাতের বরই চাষ করবেন।
স্থানীয় কেশবপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল লতিফ এসেছেন লিটনের বাগানে বরই চাষ দেখতে, এসময় লতিফ বলেন, আমরা মূলত সবজি হিসেবে সিম, বেগুন, লাউ, আলুর আবাদ করে থাকি। তবে কখনো বানিজ্যিকভাবে কাশ্মীরি ও বলসুন্দরী বরই এর আবাদ করা হয়নি। কৃষক লিটন দুই বিঘা জমিতে বরই এর বাগান করেছেন। এক বছরের মধ্যেই গাছগুলোতে বরই ধরেছে এবং বিক্রি করার উপযোগী হয়েছে। বাগান ঘুরে দেখলাম। আমিও আগামী বছরে এই জাতের বরই এর চাষ করবো বলে মনোস্থির করেছি। তবে কৃষি অফিসের সার্বিক পরামর্শ ও সহায়তা কামনা করছি।
মারমা মল্লিকপুর গ্রামের কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, এক বছর আগে যখন লিটন ভাই কাশ্মীরি ও বলসুন্দরী বরই গাছের চারা রোপন করে তখন ভেবেছিলাম হয়তো বরই ধরতে ২-৩বছর লেগে যাবে। আর রোগবালাই বেশি হবে ফলনও কম হবে। কিন্তু এখন দেখছি কম খরচে,রোগবালাই মুক্ত মাত্র ১বছরের মধ্যেই বরই ধরেছে এবং বিক্রি করার মত হয়ে গেছে। লিটন ভাইয়ের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম অন্যান্য সবজি চাষের চেয়ে বরই চাষে তুলনামূলক খরচও অনেক কম। বরই এর কলম চারা রোপন করলে ৫-৬বছর পর্যন্ত গাছ থেকে বরই পাওয়া যায়।
ভাবছি অন্যান্য সবজির পাশাপাশি আমার জমিতে এই জাতের বরই এর চাষ করবো। তবে যদি কৃষি অফিস থেকে একটু পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হয়, তাহলে আমাদের জন্য বরই চাষ করতে সুবিধা হতো।
বরই চাষি লিটন হোসেন এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, টিভিতে বিভিন্ন সময় কাশ্মীরি ও বলসুন্দরী বরই চাষের সংবাদ দেখেছি। এছাড়া আমাদের এলাকাতে বেশ কয়েকবার কৃষি কর্মকর্তারা মাঠ দিবসে বরই চাষ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। সেখান থেকেই মাথায় আসলো বরই চাষ করার। গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে চুয়াডাঙ্গা থেকে ৩০০ কাশ্মীরি ও ১২৫পিচ বলসুন্দরী জাতের চারা এনে ২বিঘা জমিতে রোপণ করি। পোকা ও পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষায় বাগানের চারপাশে মশারী জালের বেড়া দেয়া দিয়েছি।

খরচ ও লাভের বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন বলেন, আমার নিজের তেমন জমি নেই। তাই অন্যোর জমি লিজ নিয়েছি চুক্তি ভিত্তিক ৬বছরের জন্য। প্রতিবছর জমির মালিককে ২০হাজার টাকা করে দিতে হবে। আর বাগানে বরই গাছের গোড়া পরিষ্কার, স্প্রে করা, সার দেওয়া, সেচ,ওষুধ ও শ্রমিক খরচসহ মোট খরচ হয়েছে ৭০-৮০হাজার টাকার মত। প্রতিটি গাছ থেকে ৪০-৫০কেজি বরই পাওয়ার আশা করছি। ৫-৬বছর বরই গাছগুলো থেকে বরই পাওয়া যাবে। বাজারে বরইয়ের দাম ভালো পেলে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৩লক্ষ টাকা লাভ হবে। আগামী বছর আরও বেশি পরিমান জমিতে রবই চাষের পরিকল্পনা করছি। তবে আমার প্রবল বিশ্বাস বাজারে দাম কম হলেও লাভ হবেই। খুবই যতœ করেছি গাছগুলোর। আমি বিশ্বাস করি চেষ্টা, শ্রম ও পরিশ্রম করলে কোন কাজই বিফলে যায়না।
নওগাঁ সদর উপজেলার উপ-সহাকারি কৃষি অফিসার রতন আলী বলেন, নাতিশীতোষ্ণ ও উষ্ণমন্ডলীয় জলবায়ু বরই চাষের জন্য উপযোগী। ফলন ভালো, দেখতে সুন্দর এবং খেতেও সুস্বাদু এ বরইগুলো। ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকরা এখন নতুন নতুন ফসল ও ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। নওগাঁর এ অঞ্চলে এই জাতগুলোর বরই চাষ ব্যাপকভাবে নেই বললেই চলে। কাশ্মীরি ও বলসুন্দরী বরই চাষে ফলন বেশি ও দাম ভালো হওয়ায় কৃষকদের এই জাতের বরই চাষে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। লিটন হোসেন দুই বিঘা জমিতে কাশ্মীরি ও বলসুন্দরী বরই চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত তেমন কোন রোগ বালাই নেই বললেই চলে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় বরই চাষে খরচ কম ও লাভ বেশি। লিটনকে আমরা কৃষি অফিস থেকে সব ধরনের পরামর্শ ও সহায়তা দিয়েছি। সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৩লাখ টাকার মত লাভ করতে পারবেন বলে আশা করছি। আগামী বছর বরই চাষে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন স্থানীয় এই কৃষি অফিসার।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলায় বরই এর আবাদ হয়েছে ৩৪৩ হেক্টর জমিতে। এই মৌসুমে বরই এর সম্ভাব উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫৭০মেট্রিকটন। আর পার হেক্টরে জমিতে ৭৫০ মেট্রিকটন।