মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলা পরিষদে চেক জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে সরকারের এক কোটি একান্ন লক্ষ চার শত পঞ্চান্ন টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে উপজেলা পরিষদের সাবেক সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর অনুপ দাসের বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি বড়লেখা উপজেলায় কর্মরত থাকলেও ঘটনার পর থেকে ফোন বন্ধ রেখে আত্মগোপনে আছেন।
জানা গেছে, সদ্যবিদায়ী জেলা প্রশাসক মোঃ ইসরাইল হোসেন গত ২৮ অক্টোবর রাজনগর উপজেলা পরিষদ পরিদর্শনে গেলে হাটবাজার ব্যবস্থাপনা, ক্যাশ বহি, সাধারণ তহবিল, রাজস্ব তহবিল, উন্নয়ন তহবিলের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও রেজিস্টার পরীক্ষা–নিরীক্ষার সময় বিশাল অঙ্কের জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ–পরিচালক মোসা. শাহিনা আক্তারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তদন্তে উঠে আসে, অনুপ দাস মাত্র ৪ মাসে মোট ১ কোটি ৫১ লাখ ৫১ হাজার ৪৫৫ টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেন। এর মধ্যে—
রাজনগর হাটবাজার সাধারণ তহবিল থেকে প্রায় ৮০ লাখ ৫১ হাজার ৪৫৫ টাকা,
উপজেলা পরিষদ রাজস্ব তহবিল থেকে আনুমানিক ৪০ লাখ টাকা,
উপজেলা পরিষদ উন্নয়ন তহবিল থেকে আরও ৩১ লাখ টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর বা নগদ উত্তোলন করেন।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, অনুপ দাস বিভিন্ন চেকে ইচ্ছে করে খালি স্থান রাখতেন। ইউএনও স্বাক্ষর করার পর তিনি ওই চেকের টাকার অঙ্কের আগে অতিরিক্ত সংখ্যা বসিয়ে পরিমাণ বাড়িয়ে নিতেন। অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধের ভুয়া রেকর্ড দেখিয়ে পুরো অর্থ নিজের বা সহযোগীদের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেন।
টেংরাবাজার পশুর হাটের খাস আদায়ের জামানত ৫ লাখ টাকা ক্যাশ রেজিস্টারে পাওয়া গেলেও ব্যাংক স্টেটমেন্টে জমার প্রমাণ নেই; বরং পরে মতিন মিয়ার নামে উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।
সিডিবি–২৮৩৬৮৫২ নম্বর চেকে ইজারার ভ্যাট বাবদ ৮,৮৫,০১৫ টাকা দেখানো হলেও ওই চেক দিয়ে অনুপ দাস নিজের অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করেন।
সিডিবি–২৮৩৬৮৫৮ নম্বর চেকের ২১,২৫০ টাকার পরিবর্তে ৩,২১,250 টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়।
সিডিবি–১৫৫৫৫০৯ নম্বর চেকের ২৫ হাজার টাকাকে বৃদ্ধি করে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এভাবে প্রায় ২০টির বেশি চেকের মাধ্যমে অঙ্ক বাড়িয়ে বা ভুয়া খাতে ব্যয় দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেন তিনি। রাজনগরে কেলেঙ্কারি ধরা পড়ার পর তার বড়লেখা উপজেলায় কর্মকালীন সময়েও একই কায়দায় আরও ২২ লাখ টাকা জালিয়াতি করার প্রমাণ মেলে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তদন্ত চলছে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (স্থানীয় সরকার) মোসা. শাহিনা আক্তার বলেন, “তদন্তাধীন থাকায় আপাতত কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।”
এই ঘটনাটি কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিন নজরে না আসায় স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযুক্ত অনুপ দাসের বিরুদ্ধে শিগগিরই ফৌজদারি মামলা দায়ের ও অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে।