
প্রকাশ: ২ জানুয়ারি ২০২৪, ৩:১

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট বর্জনের জন্য একটি গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে। তারা আগামী ৭ জনুয়ারি ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট বিতরণ সহ প্রচারণা চালাচ্ছে। সারাদেশে নৌকার প্রার্থীদের বিপরীতে ঈগল শক্তিশালী অবস্থান নিলেও ভোলার আকাশে ঈগল ভীষণ দূর্বল অবস্থানে রয়েছে। ভোলায় নৌকার বিপক্ষে অন্য যারা আছেন তাদেরও তৎপরতা নেই। এক কথায় ভোলার পুরো নির্বাচনী মাঠ আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের দখলে। এ কারণে ভোলার ৪ টি আসনে নৌকার প্রার্থীরা নির্ভাবনায় আছেন। তবে ভোটের দিন ভোলার চারটি আসনেই ভোটার উপস্থিতি আশাতীত হবে না বলে স্থানীয় ভোটারদের অনেকেই মনে করছেন।
ভোলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, ভোলার ৪টি আসনে যে চারজনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তারা দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি করছেন। তোফায়েল আহমেদ এদের মধ্যে অন্যতম। এলাকার উন্নয়নে নিজ নিজ এলাকায় সবারই অবদান রয়েছে। এলাকার মানুষ সেটা মনে রাখবে এবং তাদের ভোট দিয়ে আবারো নির্বাচিত করবে।
ভোটের বিপক্ষে লিফলেট বিতরণ: ভোলা সদরসহ বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় ভোট বর্জনের জন্য একটি গোষ্ঠী সরব রয়েছে। তারা সুযোগ বুঝেই লিফলেট নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নেমে পড়ছে। কেন ভোট বর্জন করা হবে তা যুক্তিসহকারে উপস্থাপন করে ভোটারদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন। ভোটের দিন তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। বিএনপি - জামায়াতসহ সমমনা দলগুলোর অনেক নেতাকর্মী পৌরসভা, বিভিন্ন ওয়ার্ডে ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদেরই তৎপরতার কারণে অনেক এলাকার ভোটাররা ভোট দেয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন।
ভোলা সদরের খলিফা পট্টি এলাকার চায়ের দোকানদার মুসা মিয়া জানান, ৭ তারিখের নির্বাচনে ভোট দেয়ার ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নাই। কারণ এখানে ভোটের আমেজ নেই। শহরের কোথাও একটা পোস্টার নেই, নেই তেমন কোন জোরালো প্রচার-প্রচারণা। একজনকে জঙ্গল থেকে ধরে এনে মশাল মার্কায় দাঁড় করানো হয়েছে, তাকে কেউ চেনে না। নৌকার প্রার্থীর মরো মরো অবস্থা, তাকে ভোট দিয়ে কি হবে, তিনি তো এমনিতেই জিতবেন। এর চেয়ে বসে বসে দোকান চালানোই ভালো, তাতে পেট বাঁচবে।
দ্বীপ বেষ্টিত ভোলা জেলার চারটি আসনেই ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নেয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির হার হবে অনেক কম। এর কারণও জানিয়েছেন ভোটাররা। ভোলার ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট এলাকায় কথা হয় স্কুল শিক্ষক মফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই আসনে তোফায়েল আহমেদ সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী। তার বিপক্ষেও কোন ভাল প্রার্থী নেই। যারা আছে তাদেরকে এলাকার মানুষ চেনে না। ভোলা সদর ছাড়া অন্য তিনটি আসনেও নৌকার বিপরীতে যারা প্রার্থী হয়েছেন তারাও অপরিচিত। বিএনপির, জামায়াত, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন ও তাদের সমমনা দলগুলোর ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন না। আওয়ামী লীগের অনেক ভোটার মনে করছেন নৌকার প্রার্থী তোফায়েল আহমেদ এমনিতেই জয়লাভ করবেন। কারো একজনের ভোটে নিশ্চয়ই জয় পরাজয় নির্ভর করবে না। এসব কারণে এবার ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি আশানুরূপ না হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে নেয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভোলা সদরের খলিফা পট্টি, সদর রোড, ভেদুরিয়া, মহাজন পট্টি এলাকার কোথাও রাস্তায় কোন ধরনের পোস্টার দেখা যায়নি।
ভোলা-১
ভোলা সদর উপজেলা নিয়ে ভোলা-১ আসনে বরাবরের মতো এবারো ৮ বারের সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের ওপর আস্থা রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য, সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ নৌকার প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে বিরতিহীনভাবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটে যাচ্ছেন। ভোটারদের কাছে গিয়ে নৌকায় ভোট চাইছেন।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ভোলা এখন উন্নয়নের রোল মডেল। জননেত্রী শেখ হাসিনার কারনেই এটা সম্ভব হয়েছে। আমি আবারো নির্বাচিত হলে ভোলা- বরিশাল সেতু নির্মাণ করে ভোলার মানুষের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করবো। এক সময়ের কাঁদামাটির রাস্তা এখন সড়ক-মহাসড়কে পরিণত হয়েছে। এবার নৌকা জিতলে ভোলা বরিশাল ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। তখন ভোলার সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরো সহজ ও সুন্দর হবে।
তিনি আরো বলেন, বিএনপি-জামাত পরাজয়ের ভয়ে নির্বাচনে না এসে আগুন সন্ত্রাস করছে। নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করছে।
এই আসনে তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) প্রতীকের মো. শাজাহান, মশাল প্রতীকের বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) মো. ছিদ্দিকুর রহমান। নৌকার বিপক্ষের প্রার্থীরাও নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা তেমন নেই বললেই চলে। নৌকার বিরুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য যে জনপ্রিয়তা প্রয়োজন তা এই দুই প্রার্থীর কারোরই নেই বলে স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
লাঙ্গলের প্রার্থী মোহাম্মদ শাহজাহান মিয়া বলেন, যদি ভোটার কেন্দ্রে যায় তাহলে নৌকার বিপরীতে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দিবে বলে আমরা আশাবাদী। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে ভোটার যাবে কিনা তা নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে। কারণ এখানে ভোটের কোন উৎসব মুখর পরিবেশ নাই। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে আসেনি। সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট হবে কিনা তা এখনো বুঝতে পারছি না। তারপরেও আমরা দিনরাত ভোটারদের কাছে যাচ্ছি।
সিদ্দিকুর রহমান বলেন, তোফায়েল আহম্মেদকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো সক্ষমতা আমার নেই। তারপরও নির্বাচন করছি।
ভোটার উপস্থিতি কম বা বেশি যাই হোক ভোলার এ আসনটিতে বর্ষিয়ান নেতা তোফায়েল আহমেদের বিজয় সুনিশ্চিত।

ভোলা-২
দৌলতখান-বোরহানউদ্দিন উপজেলা নিয়ে ভোল-২ সংসদীয় আসন। বর্তমান সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুল নৌকা প্রতীক নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচন করছেন। এই আসনেও নৌকার জয় নিশ্চিত।
স্থানীয়রা বলছেন, এ আসনে নৌকার প্রার্থী আলী আজম মুকুল ছাড়া অন্য কোন প্রার্থীর প্রচার প্রচারনা চোখে পড়ছে না। নৌকা ছাড়া কোন প্রার্থী আছে বলেও মনে হয় না। ভোটের কোন আমেজ ভোলা-২ আসনেও দেখা যায়নি।
এ আসনে জাতীয় পার্টি (জেপি) থেকে বাইসাইকেল মার্কা নিয়ে নির্বাচন করছেন মো. গজনবী, বাংলাদেশ কংগ্রেস ( ডাব) মার্কা নিয়ে নির্বাচন করছেন মো. আসাদুজ্জামান, তরিকত ফেডারেশন (ফুলের মালা) প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন শাহেনশাহ মো. সামসুদ্দিন মিয়া। এদের মধ্যে শুধু নৌকার প্রার্থীর নির্বাচনী অফিস রয়েছে। অন্য কোন প্রার্থীর কোন অফিস চোখে পড়েনি। প্রার্থীদের নিজ নির্বাচনী এলাকায় কেউ চেনন না, এদের কারোরই নির্বাচনের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতাও নেই। এ আসনটিতে পঞ্চম, সপ্তম, নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়। বিএনপি বিজয়ী হয় শুধুমাত্র ১১ দিনের ষষ্ঠ ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে।
ভোলা-৩:
লালমোহন-তজুমদ্দিন উপজেলা নিয়ে ভোলা-৩ আসনে টানা চতুর্থবারের মতো নৌকার প্রার্থী হয়েছেন বর্তমান সংসদ ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নুরুননবী চৌধুরী শাওন। তার সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদন্দ্বীা করছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) জসিম উদ্দিন। তিনি ঈগল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। কিন্তু এগুলো এখানে ডানা ঝাপটাতে পারছে না। ঈগলের কোন কর্মী সমর্থক খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঈগলের পক্ষে কোন প্রচার-প্রচারণা ও দেখা যায়নি। প্রার্থী জসিম উদ্দিন ও তার স্ত্রী ভোটারদের কাছে গিয়ে ভোট চাইছেন। পোষ্টারিং ও মাইকিং করছেন।
তিনি ছাড়াও এই আসনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. কামাল উদ্দিন, বাংলাদেশ কংগ্রেস থেকে মো. আলমগীর ডাব প্রতীক নিয়ে । নির্বাচনী মাঠে তাদেরও চোখে পড়ার মতো কোন প্রচার প্রচারনা চোখে পড়নি। ভোলা-৩ আসনের সাধারন ভোটাররা বলছেন, এ আসনটিতে নৌকার প্রার্থী নুরুননবী চৌধুরী শাওন ও তার সমর্থকরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট কেন্দ্রে আসার এবং নৌকায় ভোট দেওয়ার আহবান জানাচ্ছেন। নৌকার বিপক্ষে কোন শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকায় শাওন এবারো বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন।
ভোলা-৪ :
চরফ্যাশন-মনপুরা উপজেলা নিয়ে ভোলা চার সংসদীয় আসন। এখানেও টানা চতুর্থবারের মত নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন বর্তমান সংসদ আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। বিগত সময়ে জ্যাকব এলাকার উন্নয়নে অনেক কাজ করেছেন। চরফ্যাশনের জ্যাকব টাওয়ার আজ সারাদেশে ব্যাপক সুনাম করিয়েছে। ভোলার মধ্যে চরফ্যাশনকে তিনি অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এ কারণে চরফ্যাশন ও মনপুরায় জ্যাকবের নিজস্ব অবস্থান ও ভোট ব্যাংক আছে। এই এলাকার ভোটাররা এবারো জ্যাকবের প্রতি আস্থা রাখবেন বলে জানা গেছে। তার জয় অনেকটা নিশ্চিত।
কিন্তু তারপরেও জ্যাকব তার নির্বাচনী এলাকায় ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। মানুষের কাছে গিয়ে ভোট চাইছেন। আগামী ৭ জানুয়ারীতে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য ভোটারদের আহবান জানাচ্ছেন।
এ আসনে নৌকা প্রতীকের আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের প্রতিদ্বন্দ্বীরা হচ্ছেন স্বতন্ত্র (মাথাল) প্রতীকে আবুল ফয়েজ, এনপিপির (আম) প্রতীকে আলাউদ্দিন, জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) নিয়ে মিজানুর রহমান ও তৃণমূল বিএনপির মো. হানিফ সোনালী আঁশ নিয়ে নির্বাচন করছেন ।
সাধারন ভোটাররা বলছেন, চরফ্যাশন-মনপুরায় নৌকার বিপক্ষে কয়েকজন প্রার্থী কাগজে কলমে থাকলেও নৌকা ছাড়া এখানে অন্য কোন প্রার্থীকে ভোট চাইতে দেখা যায়নি।
ভোলার জেলা প্রশাসক আরিফুজ্জামান জানান, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোলায় নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা সজাগ রয়েছে। সুষ্ঠু সুন্দর ও নিরপেক্ষ ভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতেও উৎসাহিত করা হচ্ছে।
এদিকে ভোলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ভোলা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আসাদুজ্জামান জানান, ভোলা জেলার সর্বোচ্চ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোথাও কোন আপত্তিকর ঘটনা এখন পর্যন্ত ঘটেনি। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি সহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য ভোলার চারটি নির্বাচন এলাকায় নজরদারিতে রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যাও তৎপর রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।