
প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২২, ৫:১০

কুমিল্লা দেবীদ্বার উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী আবুল খায়েরের স্ত্রী শাহিনুর বেগম (৪৫) অবৈধ পথে লিবিয়া থেকে ইটালি যাওয়ার পথে ৬ মাস ধরে লিবিয়ায় 'মাফিয়াদের' হাতে বন্দি ছেলেকে সম্প্রতি উদ্ধার করে দেশে ফিরেছেন।
শাহিনুর বেগমের ২ মেয়ে ও এক ছেলে। স্বামী লিবিয়ায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা আনতে একমাত্র ছেলে ইয়াকুব হাসান(২০) কে পাঠান লিবিয়ায়। ছেলেকে লিবিয়া পাঠানোর প্রথম ২ বছর ভালোই চলছিল তাদের সংসার। অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে 'মাফিয়াদের' হাতে ধরা পড়েন ইয়াকুব।
সরোজমিনে, সোমবার শাহিনুরের কালিকাপুরর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়,স্বজন এবং 'আশেপাশের পরিচিতরা সবাই মা ছেলেকে একটি নজর দেখতে ভিড় জমিয়েছেন। শাহিনুর বেগম বলেন সবাই বলছিল আমার ছেলে মারা গেছে। অনেকে বলেছেন, তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। ছেলেকে উদ্ধারের জন্য দালালকে প্রায় ২০ লাখ টাকা দিয়েছি। ৬ মাসেও ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে নিজেই লিবিয়ায় চলে যাওয়ারর সিদ্ধান্ত নেই।
আমার একমাত্র ছেলের ৬ মাস ধরে কোনো খবর না পেয়ে আমি ঠিকমতো খেতে পারিনি, ঘুমাতে পারিনি। শুধু কেঁদেছি আর আল্লাহর কাছে ছেলে ভিক্ষা চেয়েছি। চারটি গরু, দুই শতাংশ বাড়ির ভিটি জমি বিক্রি করে, স্বর্নালংকার বন্ধক রেখে ছেলের মুক্তির জন্য টাকা পাঠিয়েছি। সব টাকাই দালালরা খেয়ে ফেলেছেন।
সংসারের স্বচ্ছলতার জন্য ২০১৯ সালের মে মাসে দালালদের মাধ্যমে টুরিস্ট ভিসায় লিবিয়ায় অবস্থানরত পিতার কাছে ইয়াকুবকে লিবিয়ায় পাঠান। ৩৫ হাজার টাকা বেতনে বেনগাজিতে একটি তেলের কোম্পানিতে কাজ করতেন ইয়াকুব। বাপ ছেলে মিলে যা আয় করতেন তা দিয়ে সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসে। তবে ইয়াকুবের স্বপ্ন ছিল ইউরোপ গমন, আর সেই স্বপ্নই একসময় হয়ে ওঠে দুঃস্বপ্ন।
ইয়াকুব জানায়, লিবিয়ায় অবস্থানরত সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার বাংলাদেশী জাহাঙ্গীর নামের একজনের সাথে সখ্যতা এবং পরে তার পরামর্শে অবৈধভাবে সাগরপথে ইতালি যাওয়ার পরিকল্পনা করেন ইয়াকুব। ২০২১ সালের প্রথম দিকে ইতালি যাওয়ার জন্য রফিক নামের এক দালালকে ৪ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। ইয়াকুবকে প্রথমে গাড়িতে করে বেনগাজি থেকে ত্রিপলিতে নেওয়া হয়। ত্রিপলি থেকে ইয়াকুবসহ আরও কয়েকজনকে নেওয়া হয় প্রায় ১২০ কিলোমিটার পশ্চিমের জুয়ারা পোর্টে।
সেখান থেকে রাতে নৌকাযোগে তাদের গন্তব্য হয় ইতালির ল্যাম্পিদুসা দ্বীপ। ল্যাম্পিদুসা দ্বীপ থেকে জলপথে ইয়াকুবকে ইতালি নেওয়ার কথা ছিল। সর্বমোট ৩০০ জন যাত্রী ছিল জাহাজে, তাদের মধ্যে ১৫০ জনই ছিল বাঙ্গালি। যাত্রার শুররুতেই আমাদের নৌকা লিবিয়ার কোস্টগার্ডের কাছে ধরা পড়ে। কিছু মানুষকে ঘাট থেকে ২ থেকে আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। যারা টাকা দিতে পারে নাই আমিসহ অন্যদের জেলে পাঠানো হয়। জেলে আমাদের খুব অত্যাচার করা হতো। খাওয়ার জন্য একটা রুটি আর পানি দিত। ২২ দিন জেলে থাকার পর কোস্টগার্ডকে ৪ লাখ টাকা দিয়ে আমি ছাড়া পাই।

এরপরেও প্রায় ৮ মাস পর আবারো ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেন ইয়াকুব। এবার তার বিপদ আরও বেড়ে যায়। এ সময় 'মাফিয়ারা' তাকে বন্দি করে নিয়ে যান।
আমাদের যেখানে রাখা হয় সেখানে ৭ জন বাংলাদেশি আমাদের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিল। তাদের একজনের নাম সুজন। বাকিদের নাম মনে নেই। তারাও মাফিয়াদের হাতে অনেক আগে ধরা পড়েছিলেন। তবে তারা মাফিয়াদের কিছুটা বিশ্বস্ত। এই ৭ জন আমাদের নিয়মিত মারতেন। কোনো কথা ছাড়াই হাতের কাছে যা পেতেন তাই দিয়ে মারতেন। তাদের কোনো মায়া-দয়া ছিল না। তারাই আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছেন। আমাদের ৩০০ জনের জন্য প্রতিদিন ৩০০টি রুটি দেওয়া হতো। এই ৭ জন ৩০টি রুটি রেখে বাকি ২৭০টি আমাদের দিতেন। আমাদের সেগুলি ভাগ করে খেতে হত। 'আমাদের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা একজনকে অনেক অনুরোধ করে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তার ফোনটি নেই। আমি শুধু বাবাকে জায়গার নাম বলি এবং কাউকে আর কোনো টাকা না দেওয়ার জন্য বলি। কারণ সব টাকা দালালরা খেয়ে ফেলে। বাবার সঙ্গে আমার ১৭ সেকেন্ড কথা হয়েছিল।
শাহিনুর বেগম জানায়, ছেলে নিখোঁজের খবরে লিবিয়ায় থাকা তার স্বামী আবুল খায়ের ২ বার স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারও অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়ে। পাগলের মতো ছুটে বেড়াতাম। তখন নিজেই লিবিয়া যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। নিজেই গিয়ে পাসপোর্ট করি, পরে মেয়ের জামাইয়ের সঙ্গে ঢাকা যাই। ফকিরাপুল এলাকায় জোনাকি হোটেলে ওঠি এবং একজনের মাধ্যমে ভিসা ও প্লেনের টিকেটের ব্যবস্থা করি। প্রথমে সেখানে বাংলা ভাষা জানেন এমন কয়েকজনকে খুঁজে বের করে তাদের কাছে সব খুলে বলি। তারা আমাকে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। দূতাবাস ও আইওএম'র কর্মকর্তারা সব শুনে আমাকে সাহায্য করেন।
'আইওএম কর্মকর্তারা লিবিয়া সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে ইয়াকুবকে উদ্ধার করেন। তারা ফোনে আমার সঙ্গে ওর কথা বলিয়ে দেন। ফোনে যখন ছেলের কণ্ঠ শুনি তখন হাউমাউ করে কেঁদে উঠি। আমার ছেলেও ওপাশ থেকে কান্না করতে থাকে। ছেলেকে দেখার জন্য বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু লিবিয়ায় আমাদের দেখা হয়নি। ছেলে তখন ত্রিপলিতে ছিল, আর আমি বেনগাজিতে।
আইওএম ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় শাহিনুর বেগম ৮ মার্চ বেনগাজি থেকে এবং ইয়াকুব ১৬ মার্চ ত্রিপলি থেকে ঢাকায় ফেরেন। লিবিয়া থেকে ফেরার পর তাদের রাখা হয় আশকোনার হজ ক্যাম্পে। ২১ মার্চ শাহিনুর ও ইয়াকুব ফেরেন নিজ বাড়িতে।