
প্রকাশ: ২৫ মে ২০২১, ১১:৩

যতবার যাবো ততবার ভিজিট দিতে হবে নইলে খামারে গিয়ে কোন পরামর্শ দিবোনা। আর যদি সার্বিক সহায়তা ও সঠিক পরামর্শ পেতে চাও তবে খামার থেকে যা লাভ হবে তার অর্ধেক অংশ আমাকে দিতে হবে। যদি রাজি থাকো তবে বলো।
এমন অভিযোগ নওগাঁর পোরশা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শরিফুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে। তার সঠিক পরামর্শ ও অসহযোগিতার কারনে একজন খামারির প্রায় সব মুরগী মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জেলার পোরশায় রোগের প্রাদুর্ভাবে উদ্যোক্তা রবিউল ইসলাম (৩০) নামে এক সোমালী মুরগি খামারির স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। খামারে পাঁচটি শেডে এক সপ্তাহে ব্যবধানে ১২ হাজার ৭০০ পিস মুরগির মধ্যে সব মুরগী মারা গেছেন । বর্তমানে ৬০০ পিস আছে জীবিত আছে। এতে তার প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে নিবন্ধনভুক্ত ‘এ শ্রেনীর’ খামারি চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন। বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধেও দুশ্চিন্তায় আছেন।
অভিযোগ আছে- উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কোন খামারে পরামর্শের জন্য গেলে ভিজিট (পরিদর্শণ) হিসেবে টাকা দিতে হয়। অন্যথায় তিনি কোন খামারির খামারে যাবে না বা পরামর্শ দিবেন না।
উপজেলা জালুয়া গ্রামের উদ্যোক্তা রবিউল ইসলাম। একসময় তিনি প্লাস্টিকের দোকান করতেন। তবে দোকানে বেচাকেনা কম হওয়ায় লাভের পরিমাণটা ছিল কম। বাধ্য হয়ে দোকান ছেড়ে দিয়ে উদ্যোক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
২০১৮ সালে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে ব্রয়লার মুরগি দিয়ে খামার শুরু করেন। সেবার তিনি প্রায় ১২ হাজার টাকা লাভ করেন। ব্রয়লারে পরিশ্রম ও খরচের পরিমাণ বেশি হওয়ায় তা বাদ দিয়ে এবার ঝুঁকেন সোনালী মুরগীর দিকে। এরপর আর পেছনে ফিরতে হয়নি। লভ্যাংশ বেশি পাওয়ায় স্বপ্নটাও বড় হয়। খামার সম্প্রসারণ করে পাঁচটি সেড করেন।
বর্তমানে পাঁচটি শেডে বিভিন্ন বয়সের ১২ হাজার ৭০০ পিস সোনালী মুরগি। এছাড়া বাচ্চা ৯ দিন বয়সের তাপমাত্রা (ব্রুডিং) এ আছে ৩ হাজার ৫০০ পিস। তবে ৫৮ দিন বয়সের ৩ হাজার ৬০০পিস, ৪৭ দিন বয়সের ২ হাজার ৯৫০ পিস, ৩১ দিন বয়সের ৩ হাজার ৩০০ পিস এবং ১৭ দিন বয়সের ২ হাজার ৮৫০ পিস। আগামী ১০-১৫দিনের মধ্যে বড় সাইজের মুরগি বিক্রি করার উপযোগী ছিল। খামারে ৫জন কর্মচারী কাজ করতো। যারা ৭-৮ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতো।
গেল ঈদ-উল-ফিরতের পর ১৭ মে (শনিবার) রাতে হঠাৎ করে একটি সেডে চারটি মুরগি মারা যায়। পরদিন মুরগি মারা যাওয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়। দফায় দফায় এক সপ্তাহে ব্যবধানে সবগুলো মরে যায় আজ (সোমবার) সকালে প্রায় ১০০ মুরগী মারা গেছে। বর্তমানে ৬০০ পিসের মতো আছে। প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে পরামর্শ নিয়ে কোন ঔষধ দিয়েও প্রতিকার মিলছে না। তবে মুরগিতে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও ছোটগুলো এখনো ভাল আছে। মৃত মুরগিগুলোকে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে।
উদ্যোক্তা রবিউল ইসলাম বলেন, ঈদের পরদিন রাত থেকে হঠাৎ করেই মুরগি মরতে শুরু করে। বিষয়টি স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসারকে ফোনে জানানো হলে তিনি কোন গুরুত্ব দেননি। বাধ্য হয়ে জেলা কর্মকর্তাতে অবগত করা হলে আজ সকালে তিনি খামার পরিদর্শনে আসেন। তিনি পরামর্শ দেন এবং কিছু মৃত মুরগি পরীক্ষার জন্য নিয়ে যান। প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মো. শরিফুল ইসলাম কয়েকবার ইতোপূর্বে খামারে এসেছিলেন এবং টাকাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যখন টাকা দেয়া বন্ধ করি তিনি আর খামারে আসেন না।

এমনকি পরামর্শের জন্য ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেন না। যতবার এসেছেন সঠিক ভাবে কোন পরামর্শ দেয়নি। একটু খামার ঘুরে চলে যান। আর বলেন ফ্যান দিয়ে বাতাস দাও ২৪ঘন্টা ঠিক হয়ে যাবে। আর কিছু ভিটামিন জাতীয় ওধুধ খাওয়াও ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার পরও মুরগী মরতে থাকে। তার সঠিক পরামর্শ পেলে হয়তো মুরগিগুলো কিছুটা হলেও বাঁচাতে পারতাম। তার অবহেলার কারনেই মুরগীগুলো মারা গেছে।
রবিউল ইসলাম বলেন, গ্রামের অন্যান্য খামারির পরামর্শ নিয়েই খামার শুরু করেছিলাম। কয়েক দফায় বেশ লাভ ভাল হয়। এতে বড় খামার করার আগ্রহ বেড়ে যায়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে বড় করে খামার করেছিলাম। আগামী ১০-১২ দিনের মধ্যে বড় মুরগি বিক্রি শুরু হতো। কিন্তু রোগের কারণে এখন প্রায় সবগুলো মারা পড়েছে। এতে প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে। মুরগিগুলো বেঁচে থাকলে প্রায় ১৮-১৯ লক্ষ টাকার মতো বিক্রি হতো। যেখানে প্রায় ৫-৬ লক্ষ টাকার মতো লাভ হতো। কিন্তু এখন সব শেষ। একটি বেসরকারি এনজিও পাবে ৩ লাখ ও ফিডের দোকান বাকী ১০ লাখ টাকা।
এসব টাকা পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছি। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শরিফুল ইসলাম ৪/৫বার এসেছিল প্রতিবার তাকে ৫০০টাকা নিয়েছে। গত সপ্তাহে একবার এসেছিল ২০০০হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু তিনি কোন সঠিকভাবে পরামর্শ দেয়না বলে অভিযোগ করে বলেন, শেষবার গতকালও তাকে আসার জন্য অনুরোধ করা তিনি বলেন, আমি পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করবো সেই সাথে যা পারি সাপোর্ট করবো তবে খামার থেকে যা লাভ হবে তা থেকে অর্ধেক লাভের অংশ দিতে হবে। কিন্তু তার কথায় রাজি না হওয়ায় তিনি আসেনি। এর আগেও তিনি নানা বেশ কয়েকবার এমন অযোক্তিক দাবি করেছেন। তিনি তো আমাদের সহযোগিতার জন্য সরকার দায়িত্ব। কিন্তু তাদের ভিজিট দিয়ে আনতে হয় এটা কোন কথা হলো।
পোরশা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, মুরগি অসুস্থ হওয়ার ব্যাপারে ওই খামারি বিষয়টি আমাকে আগে জানায়নি। অবগত হওয়ার পর তাকে পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। অফিসের বাহিরে কোথায় সেবা দিলে গেলে দুরুত্ব ও রোগের ধরনের ওপর নির্ভর করে খামারিরা কিছু টাকা দিয়ে থাকেন। তবে আমি কোন টাকা চেয়ে নেইনি। অফিসে কেউ সেবা নিতে আসলে কোন টাকা নেওয়া হয়না। আর রবিউল সাহেবের খামারের লাভের অর্ধেক অংশ দিরে সেই শর্তে সেবা প্রদান করবো এমন অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি ফোন কেটে দেয় এর পর বেশ কয়েকবার তাকে ফোন দেয়া হলে তিনি ফোনটি রিসিভ করেননি।
নওগাঁ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. মহির উদ্দিন বলেন, খামারি রবিউল ইসলাম তার খামারের ব্যাপারে আমাকে অবগত করেন। সোমবার দুপুরে সরেজমিনে তার খামার পরিদর্শণ করা হয়। মারা যাওয়ার মুরগির কিছু নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পার্শ্ববর্তী জেলা জয়পুরহাট ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছিল। পরীক্ষার পর প্রাপ্ত রিপোর্টে আজ সন্ধ্যায় জানতে পারি রাণীক্ষেত, কক্সিডিওসিস ও গামবুরো এ তিনটি রোগ একত্রে প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।
এছাড়া ওই খামারিকে রোগ নিবারণে কিছু ঔষধ ও পরামর্শ দিয়েছি। এছাড়া মৃত মুরগিগুলো মাটি চাপা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে ওই খামারির সঙ্গে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কিছু ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে।
একজন সরকারি কর্মকর্তা টাকার বিনিময়ে পরামর্শ এবং খামারির লাভের অর্ধেক অংশ দিলে সার্বিক পরামর্শ ও সহায়তা দিবেন এটা কতটা যুক্তিসম্মত। এমন প্রশ্নের জবাবে এই কর্মকর্তা বলেন, খামারি রবিউল যদি আমাকে লিখিত অভিযোগ দেয় তবে বিষয়টি নিয়ে আমি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করবো।