
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শব্দটি মনে এলেই ভেসে ওঠে একটি থার্মো-নিউক্লিয়ার লড়াই, যাতে কেউ জিতবেনা। হারবে মানবজাতি, বর্তমান সভ্যতা হারিয়ে যাবে। যে মানুষেরা বেঁচে থাকবে তারা আবার আদিম যুগের মতো বসবাস করতে শুরু করবে নতুন এক ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীতে, যেখানে খাদ্য, বিদ্যুৎ, শিল্প, জ্বালানী, প্রচুর জীবিত মানুষ কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবেনা।
ইউক্রেন আক্রমণের পরে পুতিন তাঁর পারমানবিক এলিট ফোর্সকে একটিভ করায় অনেকেই ধরে নিয়েছিলো কিছু একটা শুরু হবে হয়তো। কিছুই হয়নি, ইউক্রেনের সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের অভূতপূর্ব প্রতিরোধে রাশানরা আলোচনা টেবিলে বসতে রাজী হয়েছে, যুগপৎ গোলা বর্ষণ এবং গোল টেবিলে বসার আয়োজন একত্রে চলছে অতি সমারোহে। এটি ভালো খবর, শান্তির সংবাদ।
এতে প্রমাণিত হয়েছে চৌধুরী বংশের জাতিরা দূর থেকে ঘেউ ঘেউ করবে মাত্র, একে অপরকে ঘায়েল করবে কিছুটা, কিন্তু কেউ কাউকে শেষ করে দেবেনা।
এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মহানাটকীয় দৃশ্যাবলীর ব্যাখ্যা ও বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উন্নত বিশ্বের মানুষদের দ্বিচারিতার নগ্ন চরিত্র বেরিয়ে এসেছে অত্যন্ত কুৎসিত ভাবে।
ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শ্বেতাঙ্গ সাংবাদিক ও রাষ্ট্র পরিচালকগন পুর্বের যুদ্ধবিধস্ত মুসলিম দেশগুলির শরণার্থীদের সাথে ইউক্রেনের শরণার্থীদের তুলনা করতে গিয়ে মুসলমানদের নিয়ে যেসব তাচ্ছিল্য ভরা মন্তব্য করেছেন, তা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে।
তাচ্ছিল্য ভরা পঞ্চাশটি কমেন্ট কপিপেস্ট করে টুইট করেছেন আমেরিকা থেকে এলেন ম্যাকলিওড।
একটি একটি স্ক্রিন শট পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, অদৃশ্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে শুধু মুসলমানদের সাথে বাকী পৃথিবীর। সম্ভবতঃ ৯/১১/২০০১ সনে টুইন টাওয়ারের রহস্যজনক অন্তর্ধানকে উছিলা করে একটি মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিলো বুশ, তার পুশ এখনো শেষ হয়নি। মন্তব্যগুলো পড়লে বুঝবেন, কেন পাগলা ষাঁড়ের মতো গুঁতাতে ইচ্ছে হচ্ছে।
বিবিসিতে ইউক্রেনের ডেপুটি এটর্নী বলেছেন, "নীল চোখের সোনালী চুলের মানুষগুলো নিহত হচ্ছে দেখে আমি আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েছি।"
আমেরিকার সিবিএস নিউজ বলেছে, "এটা ইরাক আর আফগানিস্তান নয়, এটি সভ্য, এটি একটি ইউরোপিয়ান সিটি।" এই কথার অর্থ হচ্ছে- ইরাকের মতো মুসলিম দেশগুলোর মানুষদের রেড ইন্ডিয়ান, আফ্রিকান জুলু, আর এবরোজিনদের মতো, যেভাবে খুশি যত খুশি তাঁদের মারা যায়। তাঁদের রক্ত, জীবন এবং সম্মানের মূল্য স্বর্ণকেশী চুল এবং নীল চোখওয়ালা "সভ্য" ইউরোপীয়দের থেকে অনেক কম।
বিএফএম টিভি ফ্রান্স বলছে,- "আমরা একবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে থাকি, আমাদের উপরে ইরাক, আফগানিস্তানের মতো ক্রুজ মিসাইল পড়ছে, চিন্তা করতে পারেন?"
বিএফএম টিভি ফ্রান্স আবারো বলেছে, "গুরুত্বপূর্ন প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা পলায়নপর সিরিয়ানদের কথা বলছিনা, বলছি ইউরোপিয়ানদের কথা।"
পোল্যান্ড বলছে, "এরা কি সিরিয়ার রিফিউজি? এরা হচ্ছেন খ্রিস্টান ও শ্বেতাঙ্গ তাই ইউক্রেনের লোকজনকে ঢুকতে দিচ্ছি।"

আইটিভি ইউকে বলছে, "অবিশ্বাস্য! এটাতো উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্ব নয়, এটা হচ্ছে ইউরোপ"।
আমার প্রশ্ন, কেন? --উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বের হোগা কি খোলা নাকি? যে শালার খুশি সে মেরে যেতে পারে?
আলজাজিরাতে তারা বলেছে, শরণার্থীদের পোশাক আশাক দেখুন! তাঁরা ধনী, উচ্চ মধ্যবিত্ত, তাঁরা এমন রিফিউজি নয় যাদেরকে আমরা মধ্যপ্রাচ্য আর নর্থ আফ্রিকা থেকে পালাতে দেখি, তাঁরা ইউরোপের প্রতিবেশী অন্যান্য পরিবারের মতোই।
ডেইলি টেলিগ্রাফ বলেছে, এই যুদ্ধ এই সময় ভুল, কারণ তাঁদের ইনস্টাগ্রাম ও নেটফ্লিক্স একাউন্ট আছে, এরা কোন দূরবর্তী কোনায় পরে থাকা দেশ নয়। ( কি মূর্খ! বাংলাদেশে আয় তারপর দ্যাখ, রিকশাওয়ালাও নেটফ্লিক্স দেখে!)
ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস বলেছেন যে তিনি "ইউক্রেনে নিজ থেকে যুদ্ধ করতে যাওয়া ব্রিটিশদের সম্পূর্ণ সমর্থন করেন"।
সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লিবিয়ার নিপীড়িতদের সাহায্য করতে চাইলে আপনি হবেন জেহাদী-অপরাধী এবং সেজন্যে আপনার ব্রিটিশ নাগরিকত্বও হারাতে পারেন, কিন্ত ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে গেলে এরা কেউ জেহাদী অভিযোগে অভিযুক্ত হবেনা।
ন্যাটো, ভারত, ইসরায়েল, রাশিয়া, এদের জন- নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিরোধকে সন্ত্রাসবাদ হিসাবে গণ্য করা হয়, কিন্তু ইউক্রেনীয়দের প্রতিরোধকে সিংহের সাথে তুলনা করছে পশ্চিমা মিডিয়াগুলো।
ইউক্রেনীয় একজন মহিলা যিনি মলোটভ ককটেল বোমা বানিয়েছেন নিজ ঘরে বিবিসি তাকে 'বীর' আখ্যা দিয়েছে।
যে ইঞ্জিনিয়ার শাকুন ভিটালি ইউক্রেনের হিনীচেসক ব্রিজ উড়াতে গিয়ে আত্মঘাতী হয়েছেন, তিনিও জাতীয় বীরের মর্যাদা পেয়েছেন,-স্বাভাবিক ভাবেই।
দুঃখজনক ভাবে কাশ্মীর, ফিলিস্তিন বা সিরিয়ান কোন মহিলা বা পুরুষ সাহসিকতার সাথে তাঁর নিজ মাতৃভূমির জন্যে যেকোন ধরনের অহিংস প্রতিরোধ চালালেও তাদেরকে "সিংহ-আসনে" বসানো হয়না, তাঁরা হয় জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদী।
যখন আপনার বাসভূমি, ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মালি, সোমালিয়া, ইয়েমেন,আফগানিস্তান পশ্চিমা দেশ, রাশিয়া বা তাদের আঞ্চলিক প্রক্সি দ্বারা লঙ্ঘন করা হয়, তখন তার সংজ্ঞা হয় "গণতন্ত্র আনয়ন" অথবা শাসন পরিবর্তন। আর পশ্চিমাদের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই, প্রাকৃতিক সম্পদ চুরি করার জন্য দেশ আক্রমন, অথবা শান্তি আনয়ন করার জন্যে সেনা আক্রমণ কখনই "আক্রমণ" বা "দখল" নামে কেউ ডাকতে পারবে না। বলতে হবে এসবই 'বিশ্ব-শান্তি' রক্ষার প্রয়াস আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এই যুদ্ধটিই হচ্ছে অদৃশ্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেটি শুধু চলছে গত বাইশ বছর ধরে, শুধু মুসলিম উম্মাহর বিরুদ্ধে।
কোন একদিন হয়তো একটি প্রকাশ্য বড়ো যুদ্ধ আসবে পৃথিবীতে যা এসে পৃথিবীকে পবিত্র করে দিবে, মানুষের অবিচার, অন্যায়, অহংকারকে ধুলায় মিশিয়ে দিবে।