প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২২, ১:৪৮
বঙ্গোপসাগরে ২১ মে থেকে চলছে মাছধরার উপর ৬৫ দিনের অবরোধ। এ অবরোধ উপেক্ষা করে সমুদ্রে চলছে জেলেদের মাছ শিকারের উৎসব। নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, থানা পুলিশ ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সামনেই মাছধরা, বিক্রি এবং বাজারজাত করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। জেলেদের আহরিত এসব মাছ খোলা বাজারে বিক্রি, বাজারজাত, পরিবহন করা হচ্ছে প্রকাশ্যেই। সমুদ্রে জেলেদের অবাধ বিচরণ চললেও মৎস্য কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ঠ প্রশাসনের নিরবতায় জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছেন।
মৎস্য রক্ষায় সরকারের নির্দেশনাকে অমান্য করে জেলেদের অবরোধকালীন সময়ে মাছ শিকারে সহায়তা করার অভিযোগ উঠেছে খোদ মৎস্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। মাঝে মধ্যে অভিযানের নামে চলছে নাটকীয়তা এমনটাই অভিযোগ উপকুলবাসীর। কুয়াকাটা, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র আলীপুর-মহিপুর, পাথরঘাটা, ফকিরহাট, আশাখালী, রাঙ্গাবালী, মৌডুবী, চর মোন্তাজ, ভোলার চর স¤্রাটসহ উপকুলীয় এলাকার একই চিত্র দেখা গেছে। অবরোধে সমুদ্রে মাছ শিকারের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রশাসন দুষছে মৎস্য কর্মকর্তাদের আর মৎস্য কর্মকর্তারা দূষছেন প্রশাসনকে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে আড়ৎঘাটে ইলিশ,তপসী, পোয়া,লইট্যা,ডাডিসহ সামুদ্রিক মাছের স্তুপ। আহরিত মাছের চলছে বাছাই প্রক্রিয়া। যথারীতি হাঁক ডাকে ক্রয় বিক্রয় হচ্ছে মাছগুলো। অধিক দরদাতা চালানি কারবারীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ওইসব মাছ প্রেরণে প্রক্রিয়াজাতকরণসহ পরিবহনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নিয়মমাফিক রাজস্ব আদায়ের কাজ করছেন আলীপুর মৎস্য আবতরণ কেন্দ্রর আদায়কারী কর্মকর্তারা।
দেশের সমুদ্র সীমানায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞাকালীন সময় সমুদ্রে মাছ শিকার,সংরক্ষণও বিপনন সব কিছুই চলছে প্রকাশ্যে দিবালোকে। একই অবস্থা সরকারি দুটি মৎস্য অবতরণকেন্দ্রসহ কুয়াকাটা পৌর মার্কেট, ধুলাসার, বাবলাতলা, বালিয়াতলী,চরচাপলী, আশাখালীও গঙ্গামতি এলাকার সামুদ্রিক মাছের আড়ৎঘাটে। নিষেধাজ্ঞা পালনকারী জেলেরা জানিয়েছেন, দেখবালের দায়িত্ব থাকা জেলা, উপজেলাসহ স্থানীয় প্রশাসনের গোপন সখ্যতায় এসবের সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। জেলে রুহুল মাঝি, ওয়াজেদ ঘরামী ও দেলোয়ার মোল্লা জানিয়েছেন, সমুদ্রে মাছ শিকার কাগজ-কলমে চলছে। বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
৬৫ দিনের এ দীর্ঘ সময়ে সমুদ্রে মাছ শিকারে না যাবার জন্য জেলেরা সরকারি সহয়তা আওতায় রয়েছে। বাস্তবে কিছু প্রভাবশালী ফিশিং ট্রলার মালিকরা জেলেদের সমুদ্রে মাছ শিকারে যেতে বাধ্য করছেন। এর মধ্যে কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ও মহিপুর থানা পুলিশ কয়েকদফা রুটিন মাফিক লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে জেলেদের আটকসহ আর্থিক জরিমানা করে ছেড়ে দেয়।
জনবল ও নৌযানের স্বল্পতার অজুহাত ছাড়া কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, নিজামপুর কোষ্টগার্ড, কুয়াকাটা নৌ-পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান কোন তৎপরতা না থাকায় সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রসহ সামুদ্রিক মাছের আড়তঘাটে দেদারাচ্ছে বিকিকিনি হচ্ছে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ।
অভিযোগ রয়েছে, কুয়াকাটা পৌরসভার মৎস্য আড়দদাররা কুয়াকাটা সৈকতে নিষেধাজ্ঞাকালীন অন্তত ৫ শতাধিক নৌকার দেড় হাজার জেলেকে সমুদ্রে মাছ ধরতে পাঠিয়েছে। এজন্য প্রতিটি নৌকাকে গুনতে হয়েছে ১০হাজার টাকা। অপর একটি সুত্র জানিয়েছে,মহিপুর-আলীপুর পেতাশ্রয় থেকে প্রায় দেড় শতাধিক ট্রলার গভীর সমুদ্রে ইলিশ শিকারে রয়েছে। এমনকি আহরিত মাছ সংরক্ষন,মজুদ ও বাজারজাত কারণে বরফ উৎপাদের মিলগুলোর মধ্যে কিছু কিছু সচল রাখা হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সমুদ্রে নাটকীয় অভিযানের নেপথ্যে থাকা কুয়াকাটা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এ এস আই কামরুল ইসলাম মৎস্য কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে বলেন। অভিযোগ রয়েছে কুয়াকাটা নৌ পুলিশ ফাড়ির সামনেই সমুদ্রে জেলেরা দেদারছে মাছ শিকার করছে। অভিযানের সময় কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে অভিযান না চালিয়ে, অভিযান চালানো হয় রাঙ্গাবালী উপকুলীয় সমুদ্রে। নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক অনেকেই জানান, কুয়াকাটা ও আলীপুর-মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের মাছধরা ট্রলার মালিক এবং আড়তদারদের সাথে সখ্যতা থাকায় এসব জেলেদের ধরছে না নৌ পুলিশ কিংবা কোস্টগার্ড।
কলাপাড়া উপজেলা ফিশিং ট্রলার মাঝি সমিতির সভাপতি নুরু মাঝি বলেন, আড়তগুলোতে যেসব মাছ বিক্রি হচ্ছে সবই সমুদ্রের মাছ। যা নদীর মাছ বলে চালিয়ে নিচ্ছে আড়তদার, প্রশাসন এবং মৎস্য কর্মকর্তারা। এসব অসাধু মৎস্য আড়তদারা সাংবাদিক সংগঠন গুলো ম্যানেজ করা হয়েছে বলেও বিভিন্ন লোকজনের কাছে এমন প্রচার প্রচারণা চালিয়ে আসছে।
আলীপুর-মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক শাকিল আহম্মেদ বলেন, ভৌগলিক আবস্থানের কারণে জেলেদের আহরিত মাছ চিহিৃত করা যাচ্ছে না। কোনটি সমুদ্রের এবং কোনটি নদীর। তবে জেলেসহ দাদন ব্যবসায়ীরা নদীর মাছ বলেই বিএফডিসি পাইকারি বাজারে বিক্রি করছেন। এই অবরোধকালীন সময়ে বিএফডিসির খোলা বাজারে প্রকাশ্যে মাছ বেচা কেনা নিয়েও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নদীতে কোন জেলে নৌকা কিংবা জেলেদের মাছ ধরতে দেখা না গেলেও মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের এই কর্মকর্তার এমন বক্তব্যের মধ্যদিয়ে প্রমান হয় যে মৎস্য অবরোধের নামে চলছে প্রহসন।
কলাপাড়া উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, নিষেধাজ্ঞাকালীন সমুদ্রে মাছ ধরায় পৃথক অভিযানে অসাধু জেলেদের কারাদন্ডসহ আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। অভিযান চলমান রয়েছে এবং অব্যহত থাকবে এমন দাবীও করেন ওই মৎস্য কর্মকর্তা। মৎস্য কর্মকর্তার এমন দ্বায়সারা বক্তব্যই বলে দেয় সমুদ্রে জেলেদের অবাধ বিচরনের কথা।
সামুদ্রিক প্রাণী ও জীববৈচিত্র নিয়ে কাজ করা ওয়ার্ল্ড ফিস এর সহযোগি প্রতিষ্ঠান ইকো ফিস-২ প্রকল্পের সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি জানিয়েছেন, প্রশাসনের সঠিক ব্যবস্থাপনা অভাবে সমুদ্রে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা পালন হচ্ছে না। বরফকল গুলো সচল রাখায় সামুদ্রিক মাছ সংরক্ষণ ও বিপননে সহয়তা করা হচ্ছে।
পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম আজাহারুল ইসলাম বলেন, নতুন যোগাদান করেছি। নিষোধাজ্ঞা কার্যকর করতে মাঠ পর্যায় কাজ করার কথা উল্লেখ করেন ওই কর্মকর্তা।