
প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ২:১৩

নিষিদ্ধ মৌসুমে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলজুড়ে চলছে কাঁকড়া আহরণ। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাস কাঁকড়া আহরণ সরকারিভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও তা আহরণ চলছে কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায়। বন বিভাগ থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের পাস নিয়ে স্থানীয় জেলে ও কাঁকড়া শিকারিরা ধ্বংস করছে প্রাকৃতিক সম্পদ কাঁকড়া।
জানা গেছে, সুন্দরবন উপকূলজুড়ে শত শত কাঁকড়ার ফার্ম গড়ে ওঠায় ছোট কাঁকড়ার চাহিদা থাকে বছরজুড়ে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাস সুন্দরবন এলাকার নদ-নদীতে কাঁকড়া আহরণ বন্ধ থাকলেও কাঁকড়া ফার্মের অধিক চাহিদার ফলে অসদুপায় অবলম্বর করে এবং কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করেই চলছে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের উৎসব।
সরেজমিনে শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনের কোলঘেঁষা বুড়িগোয়ালীনি নৌ পুলিশ ফাঁড়ি থেকে ১০০ গজ দূরে নদী থেকে কাঁকড়া ধরে বিক্রি করতে দেখা যায় কাঁকড়া ব্যবসায়ী রহমত উল্লাহকে। ছবি তুলতেই তিনি বলেন, 'ছবি তুলছেন কেন? সবাইকে তো টাকা দিয়েছি। ' একই রকম দৃশ্য চোখে পড়ে উপজেলার কলবাড়ী ও হরিনগর বাজারে। সুন্দরবনের খাল থেকে ভাটার সময় আহরিত হাজার হাজার কেজি কাঁকড়া ধরে এনে বিক্রি করতে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায় ব্যবসায়ীদের।
নিষিদ্ধ মৌসুমে কাঁকড়া আহরণ ও বিক্রির কথা বলতেই তাঁরা বলেন, সবাইকে তো ম্যানেজ করেই করছি। আর কাঁকড়া ধরলেই বা কী হয়? সরকার খামখেয়ালি চিন্তা-ভাবনা থেকেই কাঁকড়া ধরা বন্ধ করেছে।
হরিনগর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, 'সরকারিভাবে টহলের জন্য ইঞ্জিনচালিত বোটের তেল বরাদ্দ না থাকায় টহল দিতে পারি না। আর আমাদের থেকে ১৫০ গজ দূরে কেউ কাঁকড়া বিক্রি করলে সেটা আমাদের দায় না। '
বুড়িগোয়ালীনি নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. মোখলেছুর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, 'কেউ কাঁকড়া ধরছে বা বিক্রি করছে এমন তথ্য আমাদের কাছে নেই। তবে বিষয়টা আমি দেখে আপনাকে জানাব। '

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কাঁকড়া বিক্রেতা বলেন, 'পেটের দায়ে সবাইকে ম্যানেজ করে নদী থেকে ধরে কাঁকড়া বিক্রি করছি। তবে আমরা সকল দপ্তর ম্যানেজ করে ব্যবসা করছি। '
বন বিভাগ ও প্রশাসনের ঢিলেঢালা নজরদারির সুযোগ নিয়ে এসব অসাধু জেলে প্রাকৃতিক এ সম্পদের প্রজননকে বাধাগ্রস্ত করে চলছে বলে জানায় স্থানীয়রা। বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সুন্দরবন থেকে কাঁকড়া আহরণ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ। কিন্তু বনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার এক শ্রেণির অসাধু জেলে ও মহাজনদের অপতৎপরতার কারণে অবৈধভাবে কাঁকড়া আহরণ বন্ধ হচ্ছে না। বন বিভাগ থেকে পাস নিয়ে সুন্দরবন থেকে অবৈধভাবে আহরিত কাঁকড়া হালাল করছেন অনেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে কাঁকড়ার প্রজনন মৌসুমে আহরণ বন্ধ করা না হলে হুমকির মুখে পড়বে এই প্রাকৃতিক সম্পদ। তাই এ সম্পদ রক্ষায় আরো ভূমিকা পালন করতে হবে বন বিভাগ ও প্রশাসনকে। প্রজনন মৌসুম কাঁকড়া আহরণ বন্ধ না হলে উৎপাদন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এ সম্পদ রক্ষা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ের মধ্যে মা কাঁকড়ার ডিম থেকে প্রচুর পরিমাণ ছোট ছোট কাঁকড়ার জন্ম নেয়। তাই মা কাঁকড়া রক্ষার জন্য প্রতিবছর সুন্দরবন থেকে দুই মাসের জন্য কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়। কাঁকড়া প্রজননের জন্য সবেচেয় বড় ভাণ্ডার সুন্দরবন।
এলাকার প্রবীণ জেলেরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মা কাঁকড়া যখন ডিম দেয় তখন তাদের ধরা খুবই সহজ। ওই মুহূর্তে কাঁকড়াগুলো খুবই ক্ষুধার্থ ও দুর্বল থাকে। সামনে যেকোনো খাবার দেওয়া হলে তা দ্রুত খাওয়ার জন্য এগিয়ে আসে। ফলে প্রজনন মৌসুমে খুব সহজেই কাঁকড়া শিকার করতে পারেন জেলেরা।