
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩:৪৫

বরিশালের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী খেজুরগাছ, খেজুরের রস ও খেজুর গুড়ের পাটালি। একটা সময় শীত আসলেই ব্যস্ত হয়ে পড়তেন গাছিরা। কালের পরিক্রমায় খেজুর গাছ হারিয়ে যাওয়ায় এখন আর গাছিদের তেমন গাছ কাটতে দেখা যাচ্ছে না। খেজুরের গাছ রোপণে লোকজনের মধ্যে তেমন আগ্রহ না থাকায় খেজুরের রস হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন কৃষিবিদরা। তাদের মতে, শুধুমাত্র খেজুর গাছই নয়, সব ধরনের গাছের চারা রোপন করা উচিত।
সরেজমিনে গত কয়েকদিন বরিশালের বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, কয়েকটি গ্রামে গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য গাছ কাটছে। তবে এখন আর আগের মতো খেজুর গাছও নেই, নেই সেই রসের সমারোহ। বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা কুদ্দুছ মিয়া বলেন, কয়েক বছর আগে দেশে নিপাহ ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিলে আতঙ্কে অনেকে খেজুরের রস খাওয়া ছেড়ে দেন। সেই সুযোগে ইটভাটা মালিকদের দৌরাত্ম্যে দেদারসে খেজুরগাছ কেটে বিক্রি করতে থাকেন লোকজন। তাছাড়া প্রতিটি পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে খেজুরসহ অন্যান্য গাছ কেটে ফেলছেন।
বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ষড় ঋতুতে শীতের আগমন বৈচিত্রময়। শীতে প্রকৃতি যেন ঝিমিয়ে পড়ে। শীতের শুষ্কতায় প্রকৃতি বিবর্ণ-রুক্ষ মূর্তি ধারণ করে। শীতকাল পৌষ ও মাঘ এই দুই মাস হলেও এর শুরু কিছুটা আগে এবং শেষ হয় কিছুটা পরে। শুষ্ক চেহারা আর হীমশীতল অনুভব নিয়ে আসে শীত। এ সময় গ্রামবাংলা যেন শীতের চাদর মুড়ি দেয়। ভোরবেলা ঘন কুয়াশার ধবল চাদরে ঢাকা থাকে। হীমেল হাওয়ায় হাড় কাঁপিয়ে শীত জেঁকে বসে। শীতের দাপটে প্রকৃতি নীরব হয়ে যায়। সবুজ প্রকৃতি রুক্ষ মূর্তি ধারণ করে। শীতের শুষ্কতায় অধিকাংশ গাছপালার পাতা ঝরে পড়তে থাকে। শীত তার চরম শুষ্কতার রূপ নিয়ে প্রকৃতির ওপর জেঁকে বসে। রুক্ষতা, তীক্ততা ও বিষদের প্রতিমূর্তি হয়ে শীত আসে। শীতে প্রকৃতি বিবর্ণ হয়ে পড়ে।
শীতের সকালে খেজুরের মিষ্টি রস সবার মন কাড়ে। গাছিরা কলস ভরে রস নিয়ে আসে। খেজুরের কাঁচা রস রৌদ্রে বসে খাওয়াটাই যেন একটা আলাদা স্বাদ। খেজুর রসের পায়েস আর নলেন গুড়ের কথা ভাবলে জিহ্বায় পানি এসে যায়। শীতকালে সর্বত্র নানা ধরনের পিঠা তৈরি হয়। গ্রামে গ্রামে রঙ-বেরঙের পিঠা, ক্ষীর, পায়েস খাওয়ার ধুম। বাড়ি বাড়ি পিঠা-পুলি তৈরি হয়। রসের পিঠা, তেলে পিঠা, পাটি শাপটা, ভাপা পিঠাসহ বিভিন্ন সাচে তৈরি নানা রকমের পিঠা যা দেখলে সকলের মন কাড়ে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে শুরু হয় রকমারি পিঠা উৎসব। তাছাড়া খেজুর রসের তৈরি পায়েস আর নানা ধরনের পিঠা নিয়ে পৌষ সংক্রান্তির উৎসব জমে ওঠে। বাড়ি বাড়ি ছাড়াও সন্ধ্যায় হাটবাজারের আতপ চালের গুড়ো, নলেন গুড় ও নারিকেল কোরা দিয়ে তৈরি গরম ভাপাপিঠা ও পাটিসাপটা খেতে ভারী মজা লাগে। অন্যকে খেতে দেখলে নিজের অজান্তেই জিহ্বায় পানি এসে যাবে। তবে কালের বিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে সেই সব পিঠা পায়েস, রকমারি পিঠা ইতিহাস হয়ে যাচ্ছে।
উজিরপুর উপজেলার হারতা গ্রামের বাসিন্দা শুক্কুর ঘরামী বলেন, আগে বিকাল হতেই গাছে গাছে হাঁড়ি বসানো, সকালে রস সংগ্রহ করা, সংগৃহীত রস দিয়ে গুড় তৈরি করা অথবা বাঁকে করে হাঁড়ি ভর্তি রস বাজারে নিয়ে যেতেন গাছিরা। খেজুরের গুড় আর পাটালির ম ম গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াতো। অনেকে হাঁড়ি ভর্তি রস স্বজনদের বাড়িতে নিয়ে যেতেন। কালের বিবর্তনে এসব এখন ইতিহাস হওয়ার পথে। হারিয়ে যেতে বসেছে খেজুরগাছ। সেই সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছেন খেজুরগাছ কাটার কারিগর গাছিরা। শীতের সকালে “রস, খেজুরের মিষ্টি রস” এ ধরণের হাক-ডাক এখন আর শোনা যায় না।

শীতের দীর্ঘ রজনি কম্বল, লেপ, কাথা মুড়ি দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে রাত কাটে। সকালে উঠে সূর্য উঠার অপেক্ষায় সবাই উশখুশ করতে থাকে। চায়ের দোকানগুলোতে চা পানের ধুম পড়ে যায়। সকালের মিষ্টি রোদে ছেলেমেয়েরা চিড়া-মুড়ি, খেজুরের পাটালি গুড় খেতে খেতে রোদ পোহাতে থাকে। তবে সেসকল চিত্র এখন নেই বললেই চলে। চড়বাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রহমান ফকির বলেন, এখন খেজুর গাছ খুব একটা দেখা যায় না। অথচ আগে শীত এলে তাদের রমরমা সময় কাটত। তারপরও যতটুকু রয়েছে তার মধ্যেই কিছু লোক পুরনো পেশা ধরে রেখেছেন।
সদর উপজেলার চরকাউয়া ইউনিয়নের পারভেজ মুন্সি জানান, ইতিমধ্যে গাছ প্রস্তুত করে রস সংগ্রহ করা শুরু করেছেন। এখন পর্যন্ত গাছে রস আসা শুরু হয়নি। তিনি ৩০/৪০ টি গাছ কাটেন। একবার গাছ ছাঁটলে তিন-চার দিন রস সংগ্রহ করা যায়। পরবর্তীতে তিন দিন শুকাতে হয়। এভাবে কাটলে গাছের রস সুমিষ্ট হয়। রস সংগ্রহের পর হাঁড়ি পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়। এতে সংগৃহীত রসের গুণগত মান ঠিক থাকে বলেন তিনি।
চাঁদপাশা ইউনিয়নের দক্ষিণ ভূতের দিয়া গ্রামের মুজাফফর আলী বলেন, বর্তমানে তেমন খেজুর গাছ দেখা যাচ্ছে না। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাইলে আমাদের সবার উচিত বেশি বেশি খেজুরগাছ লাগানো এবং তার যতœ নেওয়া।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ নাসির উদ্দীন বলেন, খেজুরের গাছ রোপণে লোকজনের মধ্যে তেমন আগ্রহ না থাকায় খেজুরের রস হারিয়ে যাচ্ছে। তবে সব ধরনের গাছের চারা রোপন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।