
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২১, ১৭:৩৭

রোহিঙ্গা গণহত্যার চার বছর আজ। সেই সাথে মিয়ানমার থেকে বাস্তচ্যুত হয়ে এদেশে আগমনেরও চার বছর পূর্ণ হয়েছে। মিয়ানমারের আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর সেদেশের মগ সেনারা নির্মম নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও বাড়ি ঘরে অগ্নিসংযোগের ফলে বাস্তচ্যুত হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এদেশে পালিয়ে আসছিল। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট দলে দলে রোহিঙ্গা আসার চার বছর পূর্ণ হলো আজ। এদিকে ২৫ আগস্টকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষনা দিয়েছে রোহিঙ্গারা। ঘোষনা দেয়ার পর শুরুর দুই বছর বিক্ষোভ আর জন সমাবেশ করতে পারলেও করোনার (কোভিড-১৯) কারণে এবং সরকারের নিষেধ থাকায় জন সমাবেশ এড়িয়ে এবার মসজিদে মসজিদে নামাজের পর বিশেষ দোয়া করবেন বলে জানা গেছে।
রোহিঙ্গা নেতারা দাবী করেন, ২০১৭ সনে সেনাদের হাতে ১০০ নারী ধর্ষিত, ৩০০ গ্রামকে নিশ্চিহ্ন, ৩৪ হাজার শিশুকে এতিম, ১০ হাজারের বেশী রোহিঙ্গাকে হত্যা, ৯ হাজার ৬০০ মসজিদ, ১২০০ মক্তব, মাদ্রাসা ও হেফজখানায় অগ্নিসংযোগ, আড়াই হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে বন্দি ও ৮ লাখের বেশী রোহিঙ্গা আরকান রাজ্য থেকে বাস্তচ্যুত হয়। ২৫ আগস্ট সকালে সরেজমিন টেকনাফ উপজেলার শালবাগান (নং- ২৬) ও জাদিমুরা (নং-২৭) রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে দেখা যায়, যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সদস্যরা প্রতিটি পয়েন্টে নিয়োজিত রয়েছে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে টহল জোরদার করা করেছে।
চার বছরে একজন রোহিঙ্গাও স্বদেশ ফিরেনি:
চার বছর পূর্ণ উপলক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের একমাত্র দাবি নিরাপত্তা ও তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে জন্মভূমিতে ফেরত দেওয়া। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে খাবার দাবার দেওয়া হলেও শরণার্থী জীবন চাননা তারা। নিজ দেশে ফেরাতে জাতীয়- আন্তর্জাতিক দেশ ও সংস্থার সহযোগিতা কামনা করেন তারা।সরকার ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে দুই দেশের চুক্তি হয়। এরই প্রেক্ষিতে বেশকিছু রোহিঙ্গাকে যাচাই বাছাই করে নিশ্চয়ন করেন সে দেশের সরকার।
২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর ও ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট দুইবার প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত না হওয়ায় একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফেরেনি। বাংলাদেশও জোর করেনি। প্রত্যাবসন প্রক্রিয়া চলছে কচ্ছপ গতিতে এর মধ্যে ২০২১ সালের শুরুতে সেদেশের সেনা অভ্যুত্থানের কারণে আরো থমকে যায় এ প্রক্রিয়াটি।অপর দিকে পালিয়ে আসার এক বছর পূর্ণ হলে নানা কর্মসূচি পালন করেন রোহিঙ্গারা। পরবর্তী বছর ২০১৯ সালে এ দিবস পালন করতে গিয়ে লাখো রোহিঙ্গা সমবেত হয়। উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ৪ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরে এ সমাবেশ করে। তাদের বর্ণাঢ্য আয়োজন ও সমবেত হওয়া দেখে রাষ্ট্র নড়চড়ে বসে।
রোহিঙ্গা এদেশে আগমনের চার বছর হলেও একজন রোহিঙ্গাও স্বদেশ ফিরেনি। শুরু করতে পারেনি প্রত্যাবাসন। দুইবার উদ্যোগ নিলেও তা ভেস্তে যায়। একজন রোহিঙ্গাও রাজি হয়নি স্বদেশ ফিরতে।উল্টো রোহিঙ্গারা বিভিন্ন দাবী দিয়ে আসছে। এর মধ্যে নাগরিকত্ব প্রদান, জমিজমা ফেরত, সেনাদের বিচারে মুখোমুখি সহ ছয়টি দাবী দিয়ে আসছে ।তবে শালবাগানে কয়েকজন রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভাসমান জীবন এই কঠিন জীবন তাদের ভাল লাগছে না। ভবিষ্যৎ শুধুই অন্ধকার দেখছেন। যেভাবেই হোক আলোচনা সাপেক্ষ অতি দ্রুত নিজ দেশে ফিরতে চাই।
রোহিঙ্গাদের কারণে বিপাকে স্থানীয়রা :
উখিয়া-টেকনাফের প্রায় আট হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশী জমিতে রোহিঙ্গারা আশ্রয় শিবির গড়ে তুলেছে। প্রায় সাড়ে এগারো হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের এই দুই উপজেলাতে অবস্থান করায় নানা সংকট ও বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। রোহিঙ্গাদের কারণে দিন দিন ফুঁসে উঠছে স্থানীয়রা।
বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাফেরার কারণে স্থানীয়দের যাতায়ত ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশী দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। টেকনাফ হতে কক্সবাজারের পথে পথে প্রায় ৮টির বেশী বিভিন্ন আইন শৃংখলা বাহিনীল তল্লাশি পয়েন্ট বসিয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশী দুর্ভোগ ও সময় ব্যয় করে যেতে হচ্ছে স্থানীয়দের । শুধু তাই নই, দেখাতে হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র। অনেক সময় হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। স্থানীয়দের পাশাপাশি লেমোনেটিং আইডি কার্ড দেখিয়ে সহজেই পার হয়ে যাচ্ছে রোহিঙ্গারাও।
সস্তায় শ্রম বাজারে রোহিঙ্গা :
রোহিঙ্গারা অবাধ চলাচল করতে পারায় সস্তায় দখল করে নিয়েছে শ্রমবাজার। ফলে স্থানীয়রা বেকার হয়ে পড়েছে। উখিয়া-টেকনাফের বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চাকুরীতে ঠাঁই পাচ্ছেনা স্থানীয়রা। একদিকে রোহিঙ্গা শ্রমিক অপরদিকে ক্যাম্পে চাকুরী না পাওয়ায় বেশ হিমশিম ও বেকায়দায় পড়েছে স্থানীয় পরিবার পরিজন নিয়ে। বিশেষ করে টেকনাফ স্থল বন্দরে শত শত রোহিঙ্গা শ্রমিক প্রতিনিয়ত কাজ করেই চলেছে। রোহিঙ্গা দমনের জন্য সড়কে তল্লাশী পয়েন্ট থাকা স্বত্ত্বেও কিভাবে রোহিঙ্গারা বন্দরে কাজ করতে যেতে পারে সচেতনমহলের প্রশ্ন।এছাড়াও গাড়ীর হেলপার থেকে শুরু করে বাড়ীর কাজেও রোহিঙ্গা শ্রমিক সস্তায় কাজ করে যাচ্ছে।

হত্যা, গুম ও মাদকে জড়িত রোহিঙ্গারা: এমন কোন অপরাধ নেই যা রোহিঙ্গারা করছেনা। মাদক ইয়াবা পাচার ও বহন, হত্যা, গুম, সংঘাত, দ্বন্দ্ব ইত্যাদি অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গারা। শুধু তাই নই, বিভিন্ন দ্রব্য মুল্য উর্ধ্বগতি, পতিতাবৃত্তি, উঠতি যুবকদের চারিত্রিক অবনতি ও আইনশৃংখলার অবনতি ঘটছে এই রোহিঙ্গাদের কারনে।
রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছে স্থানীয় যুবলীগ নেতা, সিএনজি চালক। প্রতিনিয়ত অপহরন করে আদায় করছে মুক্তিপন। পাচার করছে মাদক ইয়াবা ও ভয়ংকর 'আইস'।আইন শৃংখলা বাহিনীর সাথে বন্ধুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে জকির, হাসেম উল্লাহসহ কয়েকজন কুখ্যাত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী। প্রতিদিন আটক হচ্ছে মাদক কারবারি। তাদের ভয়ে স্থানীয়দের ঘুম হারাম হয়েছে। পাহারা দিতে হচ্ছে রাত জেগে। তবে রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রনের জন্য কাঁটা তারের বেড়া ও দেওয়া হচ্ছে। বসানো হচ্ছে সি সি ক্যামরা ও ওয়াচ টাওয়ার।
২৬ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরের ষাটোর্ধ মুরব্বী সৈয়দ আহমদ কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষেরা ওপারের কবরস্থানে পড়ে আছেন। সেই সাথে জান্তা সরকারের সেনাবাহিনী আমাদের ভাই বোন, বাবা মা -বোনকে হত্যা, ধর্ষণ করে। অসংখ্য বাড়িঘর আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। এইসব দুঃসহ স্মৃতি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। এইভাবে আর কতোদিন থাকবো উল্টো প্রশ্নে করেন তিনি। যেভাবেই হোক মিয়ানমারে ফিরতে চান তিনি।২৬ নম্বর রোহিঙ্গা শিবিরের মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) বজরুল ইসলাম, বলেন, আমি রাখাইন রাজ্যের চেয়ারম্যান ছিলাম। মিয়ানমারের নির্যাতনের শিকার হয়ে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতে হচ্ছে। এ জীবন আমাদের কাম্য নয়।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দ্বারা ১৮ হাজার নারীদের ধর্ষণ , ২৫ হাজার মৃতদেহের সন্ধান, সেখানকার কারাগারে শতাধিক রোহিঙ্গাদের পিটিয়ে হত্যা, ৭৫ হাজার বাড়িঘর ও ৭২ হাজার দোকান পুড়িয়ে দেয়। এসব নির্যাতনের কারণে পালিয়ে আসতে হয়েছে। বজলু বলেন, অনেক নারী এখনো দলবেধে ধর্ষণের নির্যাতনের কথা ভুলতে পারেননি। কুড়িয়ে কুড়িয়ে খাচ্ছে তাদের। অনেকে অকপটে বললেও আবার অনেকে স্বামী সন্তানের জন্য মুখে কুলুপ এটেছেন। অথচ পরিবার ও পাশ্ববর্তীরা প্রত্যক্ষদর্শী।নির্যাতনের ভয়ে তারা ওপারে যেতে চাচ্ছেন। অন্যথায় স্বেচ্ছায় চলে যেতেন। নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিভাবে হাত বাড়ানোর অনুরোধ তার।
এব্যাপারে উপজেলা রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, যত দ্রুত সম্ভব রোহঙ্গা প্রত্যাবাসন জরুরি। নয়তো একদিন ফিলিস্তিনের মতো পরিনতি ভোগ করতে হবে। তাদের কারনে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা চরম ক্ষতি হচ্ছে।১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক এসপি তারিকুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গারা চেয়েছিল কর্মসূচি পালন করতে। কিন্তু আমরা তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছি বিধায় পালন করবেননা তারা। এখন পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে। যদি নিয়মের ব্যর্থয় ঘটে কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. পারভেজ চৌধুরী জানান, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরাতে রাষ্ট্র কূতনৈতিক তৎপরাতে অব্যাহত রেখেছে। সেইভাবে শিবিরগুলোতে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবসন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে।শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবসন কমিশনার (আরআরসি) শাহ রেজওয়ান হায়াত জানান, প্রত্যাবাসনের বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। এটি অব্যাহত রয়েছে। কোভিডের কারণে হয়তো ধীরগতি হতে পারে। তবে সকলেই একযোগে কাজ করছি।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারে চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা উখিয়া-টেকনাফের ৩০টিরও বেশী অস্থায়ী ক্যাম্পে মানবেতর জীবন যাপন করছে। গত ২০১৭ সনের ২৫ আগস্ট দেশটির রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরুর পর ১১ লাখের বেশী রোহিঙ্গা এসব শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা সব ধরনের সরকারি বেসরকারি সুযোগহ সুবিধা পেলেওে এভাবে অনিশ্চিত ভাসমান অবস্থায় দীর্ঘদিন থাকতে চাই না রোহিঙ্গারা।
আরসা নামক একটি উগ্রপন্থি সংগঠনের সদস্যরা সেনা ছাউনিতে হামলার অজুহাতে গত ২০১৭ সনের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমার সেনা বাহিনী। দেশটির সেনা, বিজিপি, ও উগ্রবাদী রাখাইন যুবকরা গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়ে রোহিঙ্গা নর-নারী, শিশুর উপর বর্বরোচিত নৃশংসতা চালায়। প্রান বাঁচাতে বানের স্রোতের মতো বাংলাদেশের দিকে ছুটতে থাকে রোহিঙ্গারা। বর্তমানে নতুন-পুরনো মিলে ১১ লাখের বেশী রোহিঙ্গা উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে।