
প্রকাশ: ৬ মার্চ ২০২৪, ১:২১

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তৈমুর রহমান ছিলেন বিএনপির এক বিশ্বস্ত যোদ্ধা। হঠাৎ তার চলে যাওয়া কোনভাবেই মেনে নেয়ার মত নয়। সত্যিকার অর্থেই আমরা এক বিশ্বস্ত নেতা হারালাম।
বুধবার (৬ মার্চ) সকাল ১১টার দিকে ঠাকুরগাঁও শহরের পাবলিক ক্লাব মাঠে জেলা বিএনপির সভাপতি প্রয়াত তৈমুর রহমানের প্রথম নামাজে জানাজায় সিঙ্গাপুর থেকে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে মহাসচিব মির্জা ফখরুল এ মন্তব্য করেন।
এ সময় তিনি আরো বলেন, আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আজকে আমার অত্যন্ত কষ্টের দিন। একজন একনিষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তি একজন সমাজসেবক এবং আমার খুব বিশ্বস্ত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আজকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। জনাব মোঃ তৈমুর রহমান শুধু বিএনপির ঠাকুরগাঁও জেলার সভাপতি ছিলেন না, তিনি তার ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলার সকলের কাছে একজন প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মেহনতি মানুষের জন্য রাজনীতি করতেন। আমার রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৯৯১ সালে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করেছেন। সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সব সময় কাজ করতেন । সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিলেন। তিনি তার জীবনের রুহিয়ার চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী তিনি ঠাকুরগাঁও উপজেলার চেয়ারম্যান দাঁড়ান এবং ২০১৫ সালে তিনি বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি কথা বলতেন কম, কিন্তু কাজ করতেন বেশি। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলার বিএনপিকে সুসংগঠিতভাবে করে রাখতেন। মানুষের কল্যাণে কাজ করতেন, দলের জন্য কাজ করতেন। তিনি যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন আমি দেখতে যেতে পারিনি। তখন আমি কারাগারে। যখন চিকিৎসার জন্য ভারতে তখন আমি কারাগার থেকে মুক্তি পাই এবং তার সাথে আমার টেলিফোনে কথা হয়। আমি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

এসময় বিপুলসংখ্যক মুসল্লির অংশ গ্রহণে অনুষ্ঠিত জানাজায় ইমামতি করেন ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব মাওলানা খলিলুর রহমান।
জানাজায় অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদ, নির্বাহী সদস্য জেড এম মর্তুজা তুলা, রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, ঠাকুরগাঁও জেলা সাধারণ সম্পাদক মির্জা ফয়সল আমিন, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হালিম, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সভাপতি বদরুদ্দিন বদর, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক বেলাল উদ্দিন প্রধান, ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাব সভাপতি মনসুর আলী, জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক রেজাউর রাজি স্বপনসহ বিভিন্ন অঙ্গনের ব্যক্তিবর্গ।
পরে বেলা সোয়া ১টায় মরহুমের গ্রামের বাড়ি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রুহিয়া সালিহিয়া মাদরাসা মাঠে বীর এই মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানানো হয়। বাদ যোহর দ্বিতীয় নামাজের জানাজা শেষে সালিহিয়া মাদরাসা-সংলগ্ন গোরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে মঙ্গলবার (৫ মার্চ) বিকেলে ভারত থেকে তৈমুর রহমানের লাশ দেশে আসে।
উল্লেখ্য, গত ১৫ ডিসেম্বর ফুসফুসে ক্যান্সারের চিকিসার জন্য ভারতে যান তৈমুর রহমান। গত ৬ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে তার অস্ত্রপচার হয়। তিনি সুস্থ্য হয়ে উঠেন এবং দেশে ফেরার প্রস্তুতিও নিচ্ছেলেন। কিন্তু গত ৩ মার্চ বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৪টায় হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। তার দুই মেয়ে ও তিন ছেলে রয়েছে।মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।তিনি স্ত্রী ৩ ছেলে ২ মেয়ে নাতি নাতনী সহ অসংখ্য গুনগ্রাহি রেখে গেছেন।

তিনি ২০১৪ সালে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।এরপূর্বে তিনি ৩ বার ১নং রুহিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৮৪ সালে প্রথমবার রুহিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। ২য় বার ১৯৯২ সালে এবং ৩য় ১৯৯৭ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে সিপিবির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
৯০ এর দিকে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন।ক্রমান্বয়ে তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সর্বশেষ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব রত ছিলেন।
বর্নীল রাজনীতিক জীবন :
উলেখ্যে তিনি মেট্রিক শেষ করে ভর্তি হন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে। রাজনীতি শুরু সেখান থেকেই। যোগ দিয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নে। ১৭ বছর বয়সে কলেজ নির্বাচনে নির্বাচিত হলেন প্রচার সম্পাদক হিসেবে। রাজনীতি কয়েক বছর চলার পর, দেশে শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। অংশ নিলেন যুদ্ধে। যুদ্ধ জয় শেষে ফিরে আসলেন দেশ স্বাধীন করেই। যুদ্ধকালীন সময়ে হয়েছিলেন পুত্র সন্তানের পিতা। যুদ্ধ শেষে এসে সন্তানের নাম রাখলেন বিপ্লব। এরপর কেটে গেল আরও কয়েক বছর। ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড় জেলার অনেক অংশই তখন ডাকাতের দখলে। নিয়মিত চিঠি দিয়ে ডাকাতি চলত। মানুষ গরুর গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছে শতরাত। আবারও ত্রাতা হয়ে ফিরে আসলেন এই বিপ্লবী নেতা। অংশগ্রহণ করলেন ইউপি নির্বাচনে আর জয়লাভ করলেন। ডাকাতের ভয়ে গরুর গলা জড়িয়ে জেগে থাকা মানুষ তখন ঘুমাতে শুরু করল নিজের বিছানায়। এযেন পরম শান্তি চারপাশের এলাকা জুড়ে। তখনকার বিখ্যাত ডাকাত ছিল "বুলু ডাকাত আর কালু চোর"।
এলাকাবাসিকে কথা দিলেন, বুলু ডাকাতের ডাকাতি নিশ্চিহ্ন করে তবেই দেশে ফিরবেন। চলে গেলেন ইন্ডিয়া। বুলু ডাকাতের ইতিহাস ওখানে শেষ করে আবারও ফিরলেন বীরের বেশে। কালু চোরের বিশাল গোফ ছিল। তার গোফ একটানে অর্ধেক ছিড়ে ফেলেছিলেন। এসবের ফলস্বরূপ ডাকাতরাও এই নেতাকে নিশ্চিহ্ন করার অনেক চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আল্লাহ প্রতিবারই তাদের চেষ্টা বিনিষ্ট করে দিয়েছেন। পেলেন রাষ্ট্রপতি স্বর্ণ পদক।চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ৩ বার৷ ৯০ এ যোগ দিয়েছিলেন বিএনপির রাজনীতিতে।ছিলেন ঠাকুরগাঁও সদর থানা বিএনপি এর সা:সম্পাদক। এরপর জেলা বিএনপি এর সাধারণ সম্পাদক। হলেন উপজেলা চেয়ারম্যান। এরপর হলেন জেলা বিএনপি এর সভাপতি। মাঝে হার্ট এর সমস্যা, কোভিড, ডেঙ্গু অনেক কিছুই এসেছিল।
জীবনে কখনও কখনও থেমে যেতে হয়, থামিয়ে দেয়। ফুসফুস ক্যান্সারে গিয়েছিলেন বোম্বে টাটা হাসপাতালে। অপারেশন এবং পরবর্তী সবই ঠিক ছিল। ফিরতি টিকিট কেটেছিলেন ৯ তারিখের। কল দিয়ে জানিয়েছিলেন, উনি আসছেন এটা যেন সবাইকে জানিয়ে দিই।আবার আমাদের গল্প হবে, আড্ডা হবে।
কিন্তু আল্লাহ অন্যকিছু চেয়েছিলেন। নক্ষত্রকেও হারিয়ে যেতে হয়। তাইতো দুনিয়ার জীবন শেষ করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।ঠাকুরগাঁও বাসী বটগাছ হারালো।