
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২০, ১৪:৩

মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খানের মৃত্যুর ঘটনায় টেকনাফ ও রামু থানায় দুটি মামলা করেছিল পুলিশ। একটি মামলায় সিনহার সঙ্গী সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও অন্যটিতে শিপ্রা দেবনাথকে আসামি করা হয়। তারা দু'জনই স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। আইন বিশেষজ্ঞ ও দুই শিক্ষার্থীর স্বজনরা বলছেন, বানোয়াট অভিযোগে ওই মামলা দায়ের করা হয়েছে। কোয়াশমেন্ট বা মামলা বাতিল অথবা পুলিশের ফাইনাল রিপোর্টের মাধ্যমে অভিযোগ থেকে তাদের মুক্তি মিলতে পারে। মুক্তি পেলে সিফাত ও শিপ্রা হতে পারেন সিনহা হত্যা মামলার মূল সাক্ষী। তদন্ত সংস্থা র্যাব মনে করছে, সিফাতের সামনেই যেহেতু ঘটনা ঘটেছে, তাই এ মামলায় তার বক্তব্য আগে জানা দরকার। গতকাল শিপ্রার জামিনের পর তার সঙ্গে কথা বলেছে র্যাব।
র্যাব বলছে, সিফাত ও শিপ্রার বক্তব্য জানার পর রিমান্ডে নিয়ে টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সিফাতের বক্তব্য আগে জানার দরকার বলেই গতকাল পর্যন্ত সাত আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়নি। আজ সোমবার প্রদীপসহ অন্য আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার কথা রয়েছে।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সিফাত ও শিপ্রার বিরুদ্ধে মামলায় করা অভিযোগ সত্য না হলে তারা মামলা বাতিল বা কোয়াশমেন্টের আবেদন করতে পারেন। এরপর তারা চাইলে সাক্ষীও হতে পারেন। আদালতে নিজেরা অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদন করে তারা বলতে পারেন যে ওই ঘটনায় তারা সাক্ষী হিসেবে বক্তব্য দিতে চান।
আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, এটা এখন স্পষ্ট, দুই শিক্ষার্থীকে জড়িয়ে যে মামলা হয়েছে, তার ভিত্তি নেই। কোয়াশমেন্ট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের মধ্য দিয়ে তারা অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে পারেন। আদালত চাইলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা বেঁধে দিতে পারেন, যাতে দ্রুত তারা মামলার ঝামেলা থেকে রক্ষা পান। আর যেহেতু তারা সিনহার সঙ্গী ছিলেন, তারা সাক্ষী হতেই পারেন।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে যা রয়েছে :জানা গেছে, এরই মধ্যে সিনহার মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাঁ কাঁধ, বাঁ হাত ও বুকের বাঁ পাশের নিচে বড় ক্ষত রয়েছে। বাঁ পাশের স্টার্নোক্লেডোমাস্টয়েড মামল ছিঁড়ে গেছে। পিঠে, পিঠের নিচে ও বাঁ ঘাড়ে ক্ষত রয়েছে। ৮, ৪ ও ৫ নম্বর রিব ফ্যাকচার এবং বাঁ পাশের স্টার্নোক্লেডোমাস্টয়েড মাসল রাপচার্ড। রক্ত বুকের পাজরের গহ্বরে জমাটবাঁধা অবস্থায় পাওয়া গেছে। মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়, প্রচুর রক্তক্ষরণ, যা ফায়ারআর্ম উইপন দিয়ে হয়েছে।
প্রদীপের সম্পদের অনুসন্ধান :দুদকসহ একাধিক সংস্থা ওসি প্রদীপ ও তার স্ত্রীর সম্পদের অনুসন্ধান চালাচ্ছে। প্রদীপের চট্টগ্রামের লালখান বাজারে একটি ফ্ল্যাট, কক্সবাজারে দুটি হোটেলের মালিকানা ও স্ত্রী চুমকির নামে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে। এছাড়া তার মৎস্য খামার ও বিদেশে বাড়ি থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার স্ত্রী চুমকি গৃহিণী হলেও ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার মৎস্য খামার তার নামে করা হয়। পাথরঘাটায় চার শতক জমি রয়েছে চুমকির নামে। যার মূল্য ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ওই জমির ছয়তলা ভবনের বর্তমান মূল্য ১ কোটি ৩০ লাখ ৫০ হাজার। পাঁচলাইশে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ কোটি ২৯ লাখ ৯২ হাজার ৬০০ টাকার জমি কেনা হয়। ২০১৭-১৮ সালে কেনা হয় কক্সবাজারের ঝিলংজা মৌজায় ৭৪০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, যার দাম ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা।
প্রদীপের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছেই :ওসি প্রদীপ জেলে যাওয়ার পর টেকনাফের অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। প্রদীপের মাধ্যমে নির্যাতন-হয়রানির শিকার অনেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। টেকনাফের বাসিন্দা ছনুয়ারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'গত বছরের ৩ ডিসেম্বর আমার স্বামীকে (আবদুল জলিল) আটকের পর থানায় ৮ মাস টর্চার সেলে নির্যাতন শেষে চলতি বছরের ৭ জুলাই গুলিতে হত্যা করে পুলিশ। আমার স্বামী এমন কী অপরাধ করেছিল, তাকে এমনভাবে গুলি করে মারতে হয়েছে।'
