
প্রতিবেশীদের জন্য ইফতার বানাচ্ছিলেন আগুনে পড়ার সময়

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৩, ২১:৩২

প্রতিবেশীদের জন্য ইফতারের খাবার তৈরি করার সময় আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয়েছে ভারতীয় এক দম্পতির। গত শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে যে ১৬ জন নিহত হয়েছেন তাদের মধ্যে ওই ভারতীয় দম্পতিও রয়েছেন।
ভারতীয় বার্তাসংস্থা পিটিআইয়ের বরাত দিয়ে সোমবার (১৭ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুবাইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ জনের মধ্যে ভারতীয় এক দম্পতিও রয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় তারা তাদের প্রতিবেশীদের জন্য ইফতারের খাবার তৈরি করছিলেন বলে একটি মিডিয়া রিপোর্টে বলা হয়েছে।
নিহত ওই ভারতীয় দম্পতির নাম ৩৮ বছর বয়সী রিজেশ কালাঙ্গাদান, এবং তার স্ত্রী ৩২ বছর বয়সী জেশি কান্দামঙ্গলাথ। তারা উভয়ই ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার বাসিন্দা। গত শনিবার যখন তাদের অ্যাপার্টমেন্টে আগুন ছড়িয়ে পড়ে তখন তারা তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের ইফতারের জন্য হিন্দুদের ফসল উৎসবের খাবার বিষুসাধ্যা তৈরি করছিলেন।

সংবাদমাধ্যম বলছে, দুবাইয়ের ওই আবাসিক ভবনের চতুর্থ তলায় ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন নিহত এবং নয়জন আহত হন। দুবাই সিভিল ডিফেন্সের একজন মুখপাত্র জানান, শনিবার বিকেলে আল রাসে আগুনের সূত্রপাত হয়। ভবনের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা মেনে চলার অভাবের কারণে আগুন লাগে বলে প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে।
রিজেশ কালাঙ্গাদান দুবাইয়ের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কোম্পানির বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। আর তার স্ত্রী জেশি কান্দামঙ্গলাথ ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা।

পিটিআই বলছে, গত শনিবার বিশু উদযাপন করছিলেন এই দম্পতি। তারা বিষুসাধ্যা নামক খাবার তৈরি করছিলেন। নিরামিষ উৎসবের এই খাবারটি কলা পাতায় পরিবেশন করা হয়ে থাকে এবং মুসলিম প্রতিবেশীদের ও কেরালার একদল ব্যাচেলরদের ইফতারের জন্য তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বলে গালফ নিউজ জানিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের শিকার ওই ভবনের ৪০৯ নাম্বার অ্যাপার্টমেন্টে সাতজন রুমমেটের সাথে থাকতেন রিয়াস কাইকাম্বাম। তিনি বলছেন, রিজেশ-জেশি দম্পতি ৪০৬ নাম্বার অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন। আর আগুনের সূচনা হয়েছিল তাদের ফ্ল্যাট সংলগ্ন ৪০৫ নাম্বার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে।

রিজেশ-জেশি দম্পতির সঙ্গে তাদের খুব বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলেও জানিয়েছেন রিয়াস কাইকাম্বাম। এমনকি এই দম্পতি তাদের উৎসবের সময় কাইকাম্বাম এবং তার রুমমেটদের আমন্ত্রণও জানাতেন।
কাইকাম্বাম বলছেন, ‘ওনাম ও বিশুর মধ্যাহ্নভোজে এর আগেও তারা আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এবার রমজান হওয়ায় তারা আমাদের ইফতারে আসতে বলে।’

কাইকাম্বাম আরও বলেন, তিনি শেষবার ওই দম্পতিকে তাদের অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে দেখেছিলেন। তার ভাষায়, ‘আমি দেখতে পাচ্ছিলাম শিক্ষক কাঁদছেন। পরে ওই দম্পতি তাদের স্টুডিও ফ্ল্যাটে ফিরে যান।’
তিনি বলেন, ‘পরবর্তীতে ফোনে কল দেওয়া হলেও কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। আমি বেলা ১২.৩৫ মিনিটে হোয়াটসঅ্যাপে রিজেশের ‘লাস্ট সিন’ স্ট্যাটাস দেখতে পেয়েছি। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, যে লোকটি আমাকে রোববারের জন্য আমার ফ্লাইটের টিকিট বুক করতে সাহায্য করেছিল, যে ব্যক্তি আমাকে ইফতারের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, সে চলে গেছে (তার স্ত্রীসহ)।’

তার রুমমেট সুহেল কোপা অগ্নিকাণ্ডের সময় বাড়িতে ছিলেন না। তিনি বলেন: ‘আমাদের প্রতিবেশীদের হারিয়ে আমরা খুবই বিধ্বস্ত। তারা এমন লোক যাদের সাথে আমরা প্রতিদিন দেখা করতাম এবং শুভেচ্ছা জানাতাম। একই সাথে বসবাস করার কথা ভাবলেও বিষয়টা আমাদের জন্য হৃদয় বিদারক। কারণ আমরা ১৬ জন এমন প্রতিবেশীকে হারিয়েছি যাদের কেউ কেউ আমাদের বেশ কাছের ছিল।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, তারা ভবন থেকে আগুনের লেলিহান শিখা দেখেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা ভিডিওগুলোতে অ্যাপার্টমেন্টের জানালা থেকে ঘন কালো ধোঁয়া এবং আগুনের শিখা লাফিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে।

অগ্নিকাণ্ডের শিকার ওই ভবনের একটি দোকানের শ্রমিকের মতে, তারা ‘বিকট শব্দ’ শুনতে পান। তার ভাষায়, ‘আমরা কয়েক মিনিটের জন্য কী ঘটছে তা বুঝতে পারিনি। কিন্তু পরে আমরা জানলা দিয়ে ধোঁয়া ও আগুন বের হতে দেখেছি।’
এদিকে রোববার এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমস জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার স্বার্থে ভবনটি সিলগালা করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে করে আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া বাসিন্দারা গৃহহীন হয়ে পড়েছেন।

ভবনের ভুক্তভোগী একজন ভাড়াটিয়া রোববার বলেন, ‘আমাদের শনিবার বিকেল ৩টার দিকে সরিয়ে নেওয়ার পর থেকে আমরা রাস্তায় অবস্থান করছি।’

সর্বশেষ সংবাদ
