"সৌদির পাঠ্যক্রমে ঢুকল রামায়ণ, মহাভারত, যুবরাজ সলমনের নয়া উদ্যোগ" সম্প্রতি এই শিরোনামে একটি সংবাদ ভাইরাল হয়েছে ভারতে।
আনন্দবাজার থেকে শুরু করে অধিকাংশ মূলধারার পত্রিকা আনন্দের সাথে সংবাদটি পরিবেশন করে যাচ্ছে। কিন্তু সংবাদটি নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরী হয়েছে পাঠকদের মধ্যে। সংবাদটিতে কিছু অংশ টুইস্টের ব্যবহারের কারনে একটু ধোঁয়াশা তৈরী হয়েছে এবং সেখান থেকেই এই বিভ্রান্তি মা মোচরের সৃষ্টি। একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। এক ফেসবুক পোস্টে জার্নালিস্টিক যুক্তির মাধ্যমে এই খবরের টুইস্ট ভেঙ্গে বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করেছেন ডাক্তার আরিফুর রহমান। আমাদের ইনিউজ৭১'এর পাঠকদের জন্য সেটি তুলে ধরা হলো।
'আনন্দবাজার লিখেছে, "এ বার থেকে ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ এবং মহাভারত পড়বেন সৌদি আরবের পডুয়ারা।"
মোচরটি হচ্ছে সৌদি আরব সরকারীভাবে এরকম কোন ঘোষণা দেয়নি। সৌদি প্রধানমন্ত্রী যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান সৌদি আরবকে রিফর্ম করছেন সব সেক্টরে। ধর্মের নামে গোড়ামীকে সরানো হচ্ছে তার টার্গেট। নারী মুক্তি ও শিক্ষা সংস্কার দিয়ে তিনি এই কাজ শুরু করেছেন। পৃথিবীর সব ধরণের ধর্ম, সংস্কার, কৃষ্টি সম্মন্ধে সাধারণ জ্ঞান দেয়ার জন্যে কারিকুলামে সব ধরনের তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। লক্ষ্য করবেন, যোগ হয়েছে সাধারন জ্ঞান বা তথ্য, --রামায়ণ বা মহাভারত ধর্মগ্রন্থ নয়।
এই সংবাদটি কোন সংবাদ নয় এটি সৌদির দক্ষিণে আসির প্রদেশের একজন নারী যোগব্যায়াম ইন্সট্রাক্টর তার নাম নৌফ আলমারাই, এটি তার টুইট বার্তা। টুইটের স্ক্রিন সট দেখুন।
টুইটে তিনি লিখেছেন, "আমার সন্তানের স্কুলের পড়াশুনার ধরণ বদলে গেছে। সব ধরনের জ্ঞানের একটা ধারণা দেয়া হচ্ছে যেমন বিভিন্ন ধর্ম, বুদ্ধের ইতিহাস, রামায়ণ, মহাভারত, কর্মা ইত্যাদি।"
শুধু ভারত নয় পৃথিবীর যাবতীয় ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে চেনানোর জন্যই এই পদক্ষেপ রিয়াদের। কিন্তু আনন্দবাজার মুচরিয়ে লিখেছে,"তাই রামায়ণ এবং মহাভারত ঠাঁই পেয়েছে পাঠ্যক্রমে।"
নৌফের টুইট এনলারজ করে মাল্টিপল চয়েস প্রশ্ন দেখুন, সেখানে জাতি, গৌতম বুদ্ধ, কর্মা, আবার উর্দু কবি ইকবাল নিয়ে মোট চারটি প্ৰশ্ন আছে।
এই স্ক্রীন সট দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছে অনেক মিডিয়া--সৌদি আরবের স্কুলে রামায়ণ পড়াচ্ছে। রামায়ণ, মহাভারত, বাইবেল, বুদ্ধ, তৌরাত, জরথ্রুস্ত, কাবালা, এরকম ৪৩০০ ধর্ম আছে পৃথিবীতে, তাদের গ্রন্থও আছে। এগুলোর যেকোনটি বা সবগুলি পড়ায় বা গবেষণা করায় কোন দোষ নেই, বরঞ্চ যত বেশি ধর্ম বিষয়ে তুলনামূলক পড়াশুনা করা হবে তত বেশি ধর্ম, সৃষ্টি ও জীবন সম্মন্ধে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
কিন্তু একজন সৌদি নারী যিনি যোগ ব্যায়ামের জন্যে ভারতের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার পেয়েছেন, টুইটের তারিখ অনুযায়ী ১৮ এপ্রিল। আর ভাইরাল হওয়া টুইটের তারিখ দেখা যাচ্ছে ১৫ এপ্রিল।
পদ্মশ্রী উপাধি পেলে যেকোন বিদেশির যেমন এক ধরনের ভারত ভালোবাসার দুর্বলতা থাকতে পারে তেমনি যার যার ধর্ম নিয়ে কোন ছোট্ট খবর পেলে সেটিকে বিশাল করে দেখানোর প্রবণতাও অনেক ধর্মপ্রেমীর থাকতে পারে। এগুলি মানুষের স্বাভাবিক চরিত্র।
কিন্তু সংবাদ পরিবেশনে সম্ভ্রান্ত সংবাদ ও সাহিত্য ঘরানাগুলি তাদের ঐতিহ্য ছেড়ে ধর্মান্ধদের অনুসরণে হ্যাট থেকে খরগোশ বের করার মতো ম্যাজিক সংবাদ পরিবেশন করবেন সেটি আশা করি নাই। দেশ, আনন্দবাজার, যুগান্তর, ইত্তেফাক, সংবাদ একেকটি বহমান নদীর মতো সাংস্কৃতিক ও সংবাদ ঐতিহ্য দুই বাংলার। এই ঐতিহ্যের ধারকেরা তাদের অবস্থান ধরে রাখবেন মান ও শান সম্মত সংবাদ পরিবেশন করে, এটুকু আশা করতেই পারি।
ধর্মান্ধতা মুসলমানদের খাচ্ছে, হিন্দুদেরও খাচ্ছে, কিন্তু কিছু সংবাদসূত্র এর বাইরে না থাকলে "এটি ঠিক হয়নি" কথাটি কে বলবে?'