
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২২, ২৩:১৪

স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারাদিয়ে দেশ মাতৃকার টানে জীবন বাঁজি রেখে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম।
একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দীর্ঘদিন থেকে সরকারের সম্মানিভাতা পেয়েছেন জেলার গৌরনদী উপজেলার সরিকল গ্রামের মৃত আমজেদ আলী হাওলাদারের ছেলে নুরুল ইসলাম। কর্মের সুবাধে ঢাকায় বসবাসের সুবাধে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও রফিকুল ইসলাম বাবলার হাত থেকে তিনি (নুরুল ইসলাম) গ্রহণ করেছেন একাধিক সম্মাননা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা শেষে দাফন করা হয়। তার (নুরুল) মৃত্যুর পর স্থানীয় এক প্রভাবশালী মুক্তিযোদ্ধার নেপথ্য মদদে শুরু হয় নানা নাটকীয়তা। এমআইএস ফরমের অনলাইনে নুরুল ইসলামের ছবির পরিবর্তে মুলাদী উপজেলার বাসিন্দা অন্য এক নুরুল ইসলামের ছবি সংযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এরপর থেকেই শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধার অসহায় পরিবারকে হয়রানী। আর এ অনৈতিক কাজের সাথে সরাসরি উপজেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের অফিস সহকারী নুরুজ্জামান জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম নুরুল ইসলামের দিনমজুর ছেলে নাসির হাওলাদার।
পুরো ঘটনাটি উল্লেখ করে তিনি (নাসির) লিখিতভাবে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। পরবর্তীতে মন্ত্রী বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ প্রদান করেন। মন্ত্রীর নির্দেশে এনিয়ে তদন্তের শুনানীতে অভিযোগকারী নাসিরের আবেদনের সত্যতা পাওয়া গেলেও রহস্যজনক কারণে গত সাত মাসেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। ফলে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের পরিবার চরম হয়রানীর পাশাপাশি আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

সূত্রমতে, ২০০৪ সালে উপজেলা ভিত্তিক মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই সভায় চূড়ান্তভাবে তালিকাভূক্ত হয় সরিকল গ্রামের মৃত আমজেদ আলী হাওলাদারের ছেলে নুরুল ইসলাম। তার বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা গেজেট নং-৩৪৯৩, লাল বই মুক্তিবার্তা নং-০৬০১১০০৬৮২, সাময়িক সনদ নং ম-১২৬১৯২, এমআইএস নং-০১০৬০০৩৯৪৮। ভাতা বই নং- ৫৫১। সোনালী ব্যাংক, গৌরনদী শাখার ০৩১২১০০১৪০৫৯ সঞ্চয়ী হিসাব নম্বরের মাধ্যমে ভাতা উত্তোলণ করে আসছিলেন নুরুল ইসলাম। ২০২০ সালের ৮ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম মৃত্যুবরন করেন।
মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের ছেলে দিনমজুর নাসির হাওলাদার বলেন, বাবার মৃত্যুর পর মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা আমার সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর-০৩১২৯০১০১৯৬৬৬ এর মাধ্যমে উত্তোলন করে আসছিলাম। এরইমধ্যে এমআইএস ফরমের ভুলক্রটি সংশোধনের জন্য অনলাইন থেকে ফরম উত্তোলন করতে গিয়ে আমার পিতার নামধারী অপরিচিত এক লোকের ছবি দেখতে পাই। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি অপরিচিত ওই ব্যক্তি মুলাদী উপজেলার গাছুয়া এলাকার বাসিন্দা। সে নিজাম উদ্দিন ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক ছিলো। মুলাদীর নুরুল ইসলাম আমার বাবার গেজেট নম্বর দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা দাবী করেন।
নাসির অভিযোগ করে বলেন, এমআইএসে আমার পিতার নামের জায়গায় মুলাদীর নুরুল ইসলামের ছবি এবং তার পিতার নাম যুক্ত করে দিয়েছে গৌরনদী উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহকারী নুরুজ্জামান। এমনকি নুরুজ্জামানের যোগসাজসে মুলাদীর নুরুল ইসলাম আমার পিতার আট মাসের মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতা উত্তোলন করে নিয়েছে। উপায়ন্তর না পেয়ে ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট বিষয়টি সমাধানের জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর বরাবরে আবেদন করি। মন্ত্রী বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ প্রদান করেন। মন্ত্রীর কাছে আবেদনের পর আমার বাবার নামধারী মুলাদীর ওই নুরুল ইসলামের মোবাইল নম্বর থেকে আব্বাস নামের এক ব্যক্তি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা দাবী করে আমাকে ফোন করেন। তিনি (আব্বাস) বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে নির্দেশ প্রদান করেন।
প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নাসির আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর কাছে আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি সমাধানের জন্য গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিপিন চন্দ্র বিশ্বাসের কার্যালয়ে উভয়পক্ষকে নিয়ে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতিতে শুনানী অনুষ্ঠিত হয়। শুনানীতে মুলাদীর ওই নুরুল ইসলাম ভূয়া হিসেবে আখ্যায়িত হয়। পরবর্তীতে সে (মুলাদীর নুরুল) আর কখনো নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিবেন না মর্মে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত মুচলেকা দিয়ে রক্ষা পায়। এর কয়েকদিন পর ওই নুরুল ইসলাম নিজের অবস্থান থেকে সরে এসে ইউএনও’র কাছে পূর্বের দেয়া মুচলেকা ভুল করে দিয়েছে বলে জানায়।

এছাড়াও সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহকারী নুরুজ্জামান ক্ষিপ্ত হয়ে আমাকে (নাসির) হুমকি দিয়ে বলেন, আমি কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তুলবো, তা তিনি দেখে ছাড়বেন। কান্নাজড়িত কন্ঠে নাসির বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছি সাত মাস অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু অদ্যবধি তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হচ্ছেনা। উপায়ন্তর না পেয়ে বিষয়টি সমাধানের জন্য পূনরায় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী ও বরিশালের জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছি।
সরিকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রবীন ব্যক্তিত্ব মোঃ ফারুক হোসেন মোল্লা বলেন, নাসিরের বাবা নুরুল ইসলাম একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এখন যে নুরুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবী করে আসছেন তার বাড়ি মুলাদী উপজেলায়। সরিকল গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাসেম বলেন, নাসিরের বাবা নুরুল ইসলাম আমার সহযোদ্ধা ছিলেন। তিনি আমাদের সাথে একাধিক সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন। সে তিনশ’ টাকা থেকে ভাতা পাওয়া শুরু করেন।
ইউএনও’র কার্যালয়ে শুনানী বৈঠকে উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধা এমএ হক বীর বিক্রম বলেন, নাসিরের বাবা সরিকলের নুরুল ইসলাম একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। মুলাদীর নুরুল ইসলাম কখনো গৌরনদীতে মুক্তিযুদ্ধ করেননি বলে ইউএনও এবং শুনানীতে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে লিখিত মুচলেকা দিয়েছে। এর কিছুদিন পর আবার ওই ব্যক্তি কতিপয় কু-চক্রী মহলের সহযোগিতায় ভুল করে মুচলেকা দেয়া হয়েছে জানিয়ে পূনরায় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবী করেন। আর তার দ্বিতীয়বারের এ দাবীর বিষয়টি প্রশাসন কিভাবে মেনে নিচ্ছে তা আমার বোধগম্য নয়। তিনি (বীর বিক্রম) সরিকলের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের পরিবারকে হয়রানি বন্ধ করার পাশাপাশি এমআইএসের ছবি ও তথ্য পরিবর্তন করার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির দাবী করেন।
পুরো বিষয়টি নিয়ে মুলাদী উপজেলার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের ব্যবহৃত (০১৭১২-৩০৮৯১৮) মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয়ের পর ফোনের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার ওই নম্বরে যোগাযোগের চেষ্ঠা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহকারী নুরুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এ ঘটনার সাথে আমার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। পুরো ঘটনার তদন্ত করলে প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রীর নির্দেশে তদন্তের শুনানীতে মুলাদী উপজেলার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের ভুল স্বীকার করে মুচলেকা দেয়ার সত্যতা স্বীকার করে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিপিন চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, খুব শীঘ্রই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।