
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২২, ২১:৩১

শারীরিকভাবে অক্ষম ৩৫ বছর বয়সী শিল্পী খাতুন। যে বয়সে আট-দশজন মেয়ের মতো শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে স্বামীর সংসার করার কথা, সেই বয়সে শিল্পীকে কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে অসহায় মা বাবার দায়িত্ব। শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ার কারণে ভিক্ষা করে খাবার তুলে দিতে হচ্ছে দৃষ্টি ও মানসিক প্রতিবন্ধী অসহায় বাবা মায়ের মুখে।
জীবন সংগ্রামী শিল্পী খাতুন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের মধ্যে জগৎপুরা গ্রামের দৃষ্টি ও মানসিক প্রতিবন্ধী হাসমত মোল্ল্যা ও ফিরোজা বেগম নামের প্রতিবন্ধী দম্পতির মেয়ে। শিল্পীর এখন একটাই চিন্তা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিক্ষা করে অসহায় বাবা-মায়ের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা। কোনো রকমে একবেলা খাবার জুটলেও দু'বেলাই না খেয়েই থাকতে হয় তাদের। অভাবের তাড়নায় মাছ মাংসের নামটাও ভুলে গেছে তারা। মাছ মাংস তাদের কাছে এখন আকাশের চাঁদ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শিল্পীর দুটি পা বিকল হওয়ায় হামাগুড়ি দিয়ে চলাচল করেন। বাবা-মাকে নিয়ে ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়কের পাশে উপজেলার জগৎপুরা গ্রামে বসবাস করেন। বাড়ির পাশের ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়কটিতে এক পাশে বসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিক্ষা করেন শিল্পী।
মাঝে মধ্যে প্রতিবন্ধী মা বাবাও মেয়ের সাথে ভিক্ষা করেন। এভাবেই প্রতিদিন ভিক্ষা করে কোনো রকমে সংসার চলে তাদের। একটি মাত্র থাকার ঘর থাকলেও তাতে নেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা। একটি টিউবওয়েল থাকলেও সেটি দীর্ঘ দিন ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। এদিকে প্রতিবন্ধী পরিবারকে বরাদ্দ থেকে অথবা নিজস্ব অর্থায়নে গভীর নলকূপ ও বিদ্যুৎ এর ব্যবস্থার কথা জানান, নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান দিদারুল আলম খান মাহবুব। জানা যায়, ভূঞাপুরের অজুর্না ইউনিয়নের জগৎপুরা গ্রামের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হাসমত মোল্ল্যা (৮০) পাঁচ বছর বয়সে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার অভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। বসতবাড়ি থাকলেও যমুনার ভাঙনে তা বিলীন হয়ে গেছে।
কোনো ট্যাগ পাওয়া যায়নি
পরবর্তীতে মধ্য জগৎপুরা সড়কের পাশে একটি টিনের ঘর তুলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস শুরু করেন। স্ত্রী ফিরোজা বেগম মানসিক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী এবং একমাত্র মেয়ে শিল্পী শারীরিক প্রতিবন্ধী। একই পরিবারের তিনজন সদস্য প্রতিবন্ধী হলেও ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও সরকারি কোনো ভাতা পান না তারা। এমনকি কোনো প্রকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেননি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
শারীরিক অক্ষম শিল্পী খাতুন বলেন, সারাদিন রাস্তার পাশে বসে ভিক্ষা করে যা পাই তা দিয়ে তাই দিয়ে কোন মতে সংসার চালাই। আমার বাবা মা দুজনেই প্রতিবন্ধী। আমারও দুটি পা বিকল, হাঁটতে অনেক কষ্ট হয়। সারাদিন রাস্তার পাশে বসে ভিক্ষা করে এক দেড়শ টাকা পাই। তাই দিয়ে খেয়ে না খেয়ে আমাদের দিন কাটে।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিল্পীর বাবা হাসমত মোল্লা বলেন, পাঁচ বছর বয়স থেকে আমি অন্ধ। আমার বউ মানসিক প্রতিবন্ধী। আমরা কোনো রোজগার করতে পারি না। আমার মেয়ে শারীরিক অক্ষম শিল্পী রাস্তায় বসে ভিক্ষা করে আমাদেরকে খাওয়ান। মেম্বার চেয়ারম্যান আমাদের কোন সাহায্য সহযোগীতা করে না।টিউবওয়েল নষ্ট, ঘরে কারেন্ট নেই। মেলা মাইসে টিউবওয়েল ও কারেন্ট দিবার চাইছিল কিন্তু দেয় না। আমাদের অনেক কষ্ট। আমি সবার কাছে সাহায্য চাই।
প্রতিবেশীরা বলেন, প্রতিবন্ধী মেয়েটি বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের পরিবারের তিনজন সদস্য সবাই প্রতিবন্ধী। শারীরিকভাবে অক্ষম মেয়েটা ভিক্ষা করে সংসারের হাল ধরেছে। ভিক্ষা করে যা পায় তাদিয়ে কোন রকমে সংসার চালায়।অজুর্না ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দিদারুল আলম খান মাহবুব বলেন, প্রতিবন্ধী পরিবারের বিষয়টি জানতে পেরেছি। তাদের তালিকা তৈরি করে সমাজসেবায় দেওয়া হবে। এ ছাড়া তাড়াতাড়ি তাদের পরিবারের জন্য টিউবওয়েল ও বিদ্যুৎ এর ব্যবস্থা করা হবে।
উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোছাঃ নার্গিস বেগম জানান, ইতিমধ্যে আমরা ইউপি চেয়ারম্যান ও সমাজসেবা অফিসারের সাথে কথা বলে প্রতিবন্ধী শিল্পীর বাবা হাসমত মোল্লার প্রতিবন্ধী কার্ড করে দিয়েছি। বাকি দুইজনের প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. শহীদুজ্জামান মাহমুদ বলেন, প্রতিবন্ধী হাসমতের ভাতার কার্ড আমরা করে দিয়েছি। তার মেয়ে শারীরিক অক্ষম প্রতিবন্ধী শিল্পীর প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড দুই এক দিনের মধ্যে হয়ে যাবে। পর্যায়ক্রমে পরিবারের তিনজন প্রতিবন্ধীকেই ভাতার আওতায় আনা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. ইশরাত জাহান বলেন, ইতিমধ্যে আমরা জানতে পেরেছি উপজেলা জগৎপুরা গ্রামের একই পরিবারের তিনজন সদস্যই প্রতিবন্ধী। বিষয়টি আমরা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সমাজসেবা অফিসারকে অবহিত করেছি, তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।