
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২১, ১:১৯

বরিশালে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র থেকে চন্দন সরকার (২৫) নামে এক যুবকের রহস্যজনক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত যুবকের স্বজনদের দাবি, তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। শুক্রবার (২৭ আগস্ট) সকালে নগরীর নবগ্রাম রোডস্থ হলি কেয়ার মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের চতুর্থ তলার মেঝে থেকে যুবকের মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোতয়ালী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক শাহজালাল মল্লিক। মৃত চন্দন সরকার জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার বড়পাইকা এলাকার চিত্তরঞ্জন সরকারের ছেলে।
উপ-পরিদর্শক শাহজালাল মল্লিক জানান, খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মৃত ওই যুবকের গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
নিহত চন্দনের মামা নিবাস মহুরী বলেন, “আমার ভাগ্নে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে আসতে চায়নি। সে বলেছিল, এসব কেন্দ্রে অনেক টর্চার করা হয়। আমরা তার কথা শুনিনি। আগস্ট মাসের ৭ তারিখ হলি কেয়ারে দিয়ে গিয়েছি। তখন কোমরের বেল্টটি পর্যন্ত রাখতে দেয়নি। রশি বা গামছাতো দূরের কথা। তিনি আরো জানান, ভোর রাতে হলি কেয়ার থেকে মোবাইলে আমাকে জানানো হয় চন্দন আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করি না। আমার ভাগ্নেকে টর্চার করে মেরে ফেলা হয়েছে। এখানে এসে তো লাশও দেখছি না। আত্মহত্যা করলে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করবে। কিন্তু এখানে লাশ উদ্ধার করেনি পুলিশ, হলি কেয়ারের লোকজনই বাথরুম থেকে লাশ ফ্লোরে এনে রেখেছে। এটি হত্যাকান্ড, আমি এই হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
হলি কেয়ারের ব্যবস্থাপক মাইনুল হক তমাল দাবী করেন, হলি কেয়ার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে মোট ২৮ জন রোগী ভর্তি ছিল। এরমধ্যে একজন ‘এক্সিডেন্টে’ মারা গেছে। এখন ২৭ জন রয়েছে। পুলিশ নিহতের লাশ উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। বিস্তারিত তারাই বলতে পারবেন।


হলি কেয়ারের চতুর্থ তলার দায়িত্বে থাকা ভলান্টিয়ার সরোয়ার বলেন, রাত সোয়া তিনটার দিকে তাকে ঘুম থেকে ডেকে জানানো হয় একজন টয়লেটে আত্মহত্যা করেছে। পরে তিনি গিয়ে দেখেন চন্দন সরকার গলায় গামছা পেচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামিয়ে মেঝেতে এনে রাখার কথা স্বীকার করেন তিনি। বাথরুমের উচ্চতায় কেউ আত্মহত্যা করতে পারেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সরোয়ার বলেন, তা বলতে পারবো না, তবে লাশ সেখান থেকে উদ্ধার করেছি।
অপরদিকে ভর্তিকৃত অন্যান্য রোগীরা জানান, ভলান্টিয়ারের দায়িত্বে থাকা সরোয়ার কথায় কথায় রোগীকে মারধর করে। গতকাল রাত সাড়ে দশটার দিকে চন্দন সরকারকে মারধর করা হয়। শেষ রাতে জানানো হয়, তিনি মারা গেছেন। অভিযুক্ত সরোয়ার এ বিষয়ে বলেন, গতকাল রাতে চন্দন সরকার পশ্চিম দিকে পা দিয়ে শুয়ে থাকায় আরেক রোগী তারিকুল তাকে নিষেধ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে চন্দন তারিকুলকে ঘুষি মারেন। এসময় চন্দনকে নিবৃত্ত করতে গিয়ে কয়েকটি ‘থাপ্পড়’ দিয়েছি। কিন্তু তাকে কোন নির্যাতন করিনি।
জানা যায়, বরিশাল নগরীর মাদক নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে রোগী নির্যাতনের অভিযোগ আছে অনেক আগে থেকেই। এসব নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসাধীন ভুক্তভোগীদের অভিভাবকরা জানান, নামে মাত্র মাদক নিরাময় কেন্দ্র। তবে সেখানে কোন ডাক্তার বা নার্স নাই। যখন তখন গায়ে হাত তোলে। ওদের কথা না শুনলে মারে। ঠিক মতো চিকিৎসা দেয় না। তাদের মতে, সেবার বদলে বেশি মুনাফার লোভে কেন্দ্রগুলো কখনও কখনও টর্চার সেলে পরিণত হচ্ছে। আরো জানা যায়, কোন কোন কেন্দ্রের ভেতরে পর্যন্ত যেতে দেয়া হয় না। এ ধরণের লুকোচুরি বা গোপনিয়তার কারণ কি? এটা প্রশাসনের ক্ষতিয়ে দেখা উচিত। এ ব্যাপারে জানতে বরিশাল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক পরিতোষ কুমার কুন্ডুর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, তাদের দফতর থেকে যদি শতভাগ নজরদারি করা হয় তবে অনেকেরই লাইসেন্স থাকবে না। সেক্ষেত্রে রোগীগুলো কোথায় যাবে? বলেন তিনি।