
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২১, ১৩:৪৪

বরিশালের উজিরপুরের শিকারপুর ‘সুনন্দা শক্তিপীঠ মন্দির’ (শ্রী শ্রী উগ্রতারা মন্দির)। উপমহাদেশের ৫১টি সতী পীঠের অন্যতম শিকারপুরের সুনন্দা শক্তিপীঠ বা উগ্রতারা মন্দির, যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকী উদযাপন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পঞ্চাশতম বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরকালে ২৭ মার্চ বরিশালের সুনন্দা শক্তিপীঠ মন্দিরটি পরিদর্শন করবেন বলে জানা গেছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বরিশালে সম্ভাব্য সফর উপলক্ষে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ভারতীয় হাইকমিশন এবং দেশটির স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) দুটি দল বরিশাল এসে সম্ভাব্য সফরের খুঁটিনাটি সব বিষয় পরখ করে গেছেন।
আর নরেন্দ্র মোদীকে বরণ করে নেয়ার সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে মন্দির কমিটিসহ বরিশালবাসী। এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার বিষয়ে সব ধরণের প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন বরিশালের পুলিশ সুপার।
শক্তিপীঠ হিন্দুধর্মের পবিত্রতম তীর্থগুলির অন্যতম। লোকবিশ্বাস অনুসারে, শক্তিপীঠ নামাঙ্কিত তীর্থগুলিতে দেবী দাক্ষায়ণী সতীর দেহের নানান অঙ্গ প্রস্তরীভূত অবস্থায় রক্ষিত আছে। শিকারপুরের শক্তিপীঠ মন্দির একান্ন সতীপীঠের একটি পীঠ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে (সুনন্দা শক্তিপীঠ মন্দির) সতীর নাসিকা পড়েছিল।
সরেজমিনে শিকারপুরের শক্তিপীঠ মন্দিরে গিয়ে দেখা গেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে বরণ করে নিতে সবধরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে মন্দির কমিটির লোকজনসহ স্থানীয় প্রশাসন। নরেন্দ্র মোদীর আগমন উপলক্ষে মুন্ডপাশা গ্রামে মন্দিরের সড়কটিতে বসানো হয়েছে নিরাপত্তা চেকপোস্ট। এছাড়া মন্দিরের অভ্যন্তরে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে।
‘সুনন্দা শক্তিপীঠ মন্দির’ মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক অমল কুমার দাস গুপ্ত জানান, আনুমানিক হাজার বছর পূর্বে অর্থাৎ কলিযুগে শিকারপুরের মুন্ডুপাশা গ্রামে এ মন্দিরটি স্থাপন করা হয়। তবে ইতিপূর্বে কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান শক্তিপীঠ মন্দির পরিদর্শণে আসেনি। অবশ্য ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিসহ একাধিক বিচারপতি এই মন্দিরটি পরিদর্শন করেছেন।
এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী আসবে এমনটি জানতে পেরে তারা তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন করে ২০টি সহ ২৮টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করেছেন। তিনি আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগমন উপলক্ষে তারা প্রতিদিনই সভা করছেন।
অমল কুমার দাস গুপ্ত জানান, বৈশি^ক মহামারী করোনার পূর্বে প্রতিদিন প্রায় ৬০/৭০ জন দর্শনার্থী এলেও করোনার কারণে এখন দর্শনার্থীর সংখ্যা কিছুটা কম। এছাড়া পূজা ও মেলার সময় এ মন্দিরে আনুমানিক ৭/৮ হাজার লোকের সমাগম হয় বলেও জানান তিনি।
উজিরপুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অপূর্ব কুমার গাইন জানান, মুন্ডপাশা গ্রামে সকল ধর্মের মানুষ অত্যন্ত সম্প্রীতিপরায়ন। তাদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নাই। প্রতিবছর বিভিন্ন পূজা পার্বনে সকল ধর্মের মানুষ এ মন্দিরে এসে আনন্দ উপভোগ করেন।
“সুনন্দা শক্তিপীঠ” মন্দিরের পুরোহীত সুশান্ত চ্যাটার্জী দীর্ঘ ২৯ বছর যাবত এ মন্দিরে পুরোহীতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জানান, আগামী ২৭ মার্চ বিশেষ কোন পূজা নেই। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যদি পূজা করতে চান তবে তার সুব্যবস্থা করা হয়েছে এবং তিনি পূজা করতে পারবেন।
“সুনন্দা শক্তিপীঠ” মন্দিরের সহসভাপতি দেবাশীষ দাস জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগমন উপলক্ষে গত ৫ মার্চ উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে একটি বিশেষ সভা করা হয়েছে।
ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রনতী বিশ^াস, মন্দিরের সভাপতি ডা. পীযুষ কান্তি দাস, দাতা সদস্য এ্যাড. বলরাম পোদ্দার, উপজেলা চেয়ারম্যান আঃ মজিদ বাচ্চু, পৌর মেয়র গিয়াসউদ্দিন ব্যাপারী, উজিরপুরের এ্যাসিল্যান্ড ও থানার ওসি সহ মন্দিরের সকল সদস্যবৃন্দ। এ সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগমন সফল করতে সব ধরণের প্রস্তুতির বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রনতী বিশ^াস বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এখানে আসার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত অফিসিয়ালভাবে কোন চিঠি পাননি। আর একজন রাষ্ট্রপ্রধান এখানে আসলে তার সিকিউরিটি ব্যবস্থা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
তবে স্থানীয় প্রশাসন হিসেবে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগীতা থাকবে বলেন তিনি। শক্তিপীঠ মন্দিরটি হাইওয়ে সড়কের খুব কাছে। এছাড়া এখান থেকে এয়ারপোর্ট, বরিশাল সার্কিট হাউজ, শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও খুব দূরে নয়। সেক্ষেত্রে সব ধরণের সুবিধা রয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিকারপুর বা উজিরপুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে ধর্মীয় সম্প্রীতি খুব ভাল।বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বরিশাল সফর সংক্রান্ত চুড়ান্ত কোন সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য বরিশাল সফরের জন্য বাংলাদেশের ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার সঞ্জীব কুমার ভাটী এবং ভারতীয় হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি অনিমেষ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি দল বরিশালের নিরাপত্তা, যাতায়াত, আবাসন ও মেডিক্যালসহ সংশ্লিষ্ট সব সুযোগ-সুবিধা পর্যবেক্ষণ করে গেছেন।
পাশর্^বর্তী দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর এ সফর নির্বিঘœ ও সফল করতে সব ধরণের প্রস্তুতির পাশাপাশি তাঁকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ বরিশালের মানুষ।
বরিশালের পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বরিশাল সফর উপলক্ষে ইতিমধ্যে শক্তিপীঠ মন্দির এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তাছাড়া তাঁর নিরাপত্তা বিষয়ে সব ধরণের প্রস্তুতিও নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
শক্তিপীঠ মন্দির ঃ শক্তিপীঠ হিন্দুধর্মের পবিত্রতম তীর্থগুলির অন্যতম। লোকবিশ্বাস অনুসারে, সত্য যুগের কোনও এক সময়ে মহাদেবের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দক্ষ রাজা বৃহস্পতি নামে এক যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন।
কন্যা সতী দেবী তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ‘যোগী’ মহাদেবকে বিবাহ করায় দক্ষ ক্ষুব্ধ ছিলেন। দক্ষ মহাদেব ও সতী দেবী ছাড়া প্রায় সকল দেব-দেবীকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। মহাদেবের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সতী দেবী মহাদেবের অনুসারীদের সাথে নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন।
দক্ষ দেবী মহামায়া কে কথা দিয়েছিলেন তিনি তার কোন রূপ অপমান করলে তিনি তাকে ত্যাগ করবেন। কিন্তু সতী দেবী আমন্ত্রিত অতিথি না হওয়ায় তাকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া হয়নি। অধিকন্তু দক্ষ মহাদেবকে অপমান করেন। সতী দেবী তার স্বামীর প্রতি পিতার এ অপমান সহ্য করতে না পেরে যোগবলে আত্মাহুতি দেন।
শোকাহত মহাদেব রাগান্বিত হয়ে দক্ষর যজ্ঞ ভন্ডুল করেন এবং সতী দেবীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। অন্যান্য দেবতা অনুরোধ করে এই নৃত্য থামান এবং বিষ্ণুদেব তার সুদর্শন চক্র দ্বারা সতী দেবীর মৃতদেহ ছেদন করেন।
এতে সতী মাতার দেহখন্ডসমূহ ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পড়ে এবং পবিত্র পীঠস্থান (শক্তিপীঠ) হিসেবে পরিচিতি পায়। অর্থাৎ সতী দেবীর শরীরের বিভিন্ন অংশ বা অলঙ্কার যা শ্রী বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র দ্বারা ছেদনের পর সেই ‘স্থানে’ পতিত হয়েছিল এবং মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার শিকারপুরের তারাবাড়িতে উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহি সতীর ৫১ পিঠের একটি শ্রীশ্রী উগ্রতারা মন্দির (সুনন্দা শক্তিপীঠ)। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এখানে দেবী জগদম্বা সতী দেবীর নাসিকা পতিত হয়েছিল। পীঠদেবী সুনন্দা এখানে উগ্রতারা রূপে পৃজিতা।