প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২১, ২৩:২৯
কবে খুলবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষার্থীদের এই ক্ষতি কি পুরণ হবে আদৌ? এমন প্রশ্নের উত্তর খুজছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। দিনের পর দিন স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যহত থাকায় একটা অস্বাভাবিক প্রজন্ম গড়ে উঠছে এমন আশঙ্কা সচেতন মহলে।
অনেকেই বিকল্প ব্যবস্থায় সাময়ীক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনলাইন ক্লাসের প্রতি জোর দেওয়ার কথা বললেও এসব ক্লাসে শিক্ষার্থী উপস্থিতি খুবই কম বলে জানিয়েছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানগন। এদিকে লেখা-পড়ার চাঁপ না থাকায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ উদ্বীগ্ন অভিভাবকরা। অফুরন্ত সময়ের অসৎ ব্যবহার করছে শিক্ষার্থীরা এমন অভিযোগও করছেন তারা। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের অভিভাবকরা বেশি দু:শ্চিন্তায় বলে জানা গেছে তাদের সাথে কথা বলে।
ধানমন্ডি এলাকার যষ্ঠ শ্রেনী পড়ুয়া আবির আব্দুল্লাহর মা ইভানা আলম মুন্নির সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমার ছেলে এবার অটোপাশের মাধ্যমে সপ্তম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্ত গত বছরে তার কোন পড়া শোনাই হয়নি। স্কুল ও ক্লাস বন্ধ থাকায় তাকে সেভাবে গাইড করে পড়া লেখায় যুক্ত রাখা যায়নি।
পড়া শোনা না করে পরের ক্লাশে উত্তীর্ণ হয়ে আসলে কতটা লাভবান হওয়া যাবে সেটা একটা প্রশ্ন। এভাবে বই না পড়ায় এ্যাকাডেমিক পড়া শোনায় আমার ছেলের অনিহা তৈরী হয়েছে এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছি। পড়া লেখা নেই,খেলাধুলা নেই এমন অবস্থায় সে সারাদিন ফোন আর ল্যাপটপ নিয়ে থাকে। স্মার্ট ডিভাইসের প্রতি আশক্ত হয়ে যাচ্ছে। এমন অবস্থার দ্রুত পরিত্রাণ না হলে একটা অস্বাভাবিক প্রজন্ম গড়ে উঠবে আমাদের। যারা হারাবে জীবনের স্বাভাবিকতা।
কথার সত্যতা মেলে আবিরের সাথে আলাপ করে। আবির জানান,স্কুলে গিয়ে ক্লাস করার জন্য মুখিয়ে আছি। এভাবে ঘরে থেকে থেকে আমি বিরক্ত ও হতাশ। স্কুলের চাপ না থাকায় আমার আর বই পড়তে ইচ্ছে করে না। সারাদিন গেম খেলেই পার করি,অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। একবার স্কুলে যাওয়ার কথা ভাবলেও পরেই আবার মনে হয় স্কুলে গিয়েও আর মন টিকবে না।স্কুলে আমার কোন বন্ধু নেই,পুরনো বন্ধুরা কে কোথায় আছে জানি না। স্কুলে গেলেও আর আগের মতো আনন্দ হবে না মনে হয় তাই না? এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে উত্তরের অপেক্ষা করে সে।
পড়া শোনা না থাকায় স্মার্ট ফোন ও ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা নানা ধরণের আশঙ্কাজনক কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছেন বলে মন্তব্য করেছেন গাজীপুর টঙ্গি এলাকার এক অভিভাবক মাসুম মাহবুব। তিনি বলেন, সন্তানদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ, এই চিন্তায় যখন অভিভাবকদের 'ত্রাহি মধুসূদন' অবস্থা তখন দুশ্চিন্তায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে স্মার্টফোন ও ডিজিটাল ডিভাইস।
পড়া লেখা না থাকায় তারা এসবে আশক্ত হয়ে যাচ্ছে। টিকটক,লাইকি বা আরোও নানা সফটওয়্যার দিয়ে কুরুচিপূর্ণ কার্যকলাপ করছে। যা আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে খুবই বেমানান। অনেকেই এসবের মাধ্যমে অস্বাভাবিক সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছে। হাতে অফুরুন্ত সময় থাকলে সেটার খারাপ ব্যবহার হবেই এটাও স্বাভাবিক কিন্তু এই বয়সে অভিভাবকরা তাদের সব সময় নজরদারীও করতে পারবে না। তাদের প্রাইভেসির কথা বলে তারা অভিভাবকদের কোণঠাসা করে রাখে।এমন উভয় সংকট থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে সেটাই জানতে চাই!
সার্বিক বিষয় নিয়ে দেশ সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নুন স্কুল এ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ফওজিয়া খাতুনের সাথে কথা হলে তিনি ইনিউজ৭১-কে জানান, এই অবস্থায় শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতিটা হচ্ছে সেটা অপূরণীয়। তারা নানা মুখি ক্ষতির সন্মুখীন হচ্ছে এটা সত্য।তবে,জীবনটা তো বাঁচাতে হবে। করোনা কিওর না হলে তো স্কুলে এসে শিক্ষাগ্রহণ বা পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না।
আমাদের দেশে এমন বাস্তবতা নেই যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্কুল কলেজ খুলে দেবে। আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দেশের এমন কোন প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া যাবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানে আসতে পারছে না আর তারা যদি প্রাতিষ্ঠানে না আসতে পারেন তাহলে তো তাদের পুর্ণাঙ্গ শিক্ষাকার্যক্রম সম্পন্ন হয় না।আসলে সরাসরি শিক্ষাগ্রহণের একটা গুরুত্ব আছে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ একটা শিক্ষা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে যায়। তাদের পরীক্ষা,পাঠদান পাঠ্য বইয়ের বাহিরে সহপাঠীদের থেকে শেখা,শিক্ষকদের সান্নিধ্য, ডিসিপ্লিন অনেক কিছুই শেখার থাকে। যা তাদের বাস্তবমুখী জীবন গঠনে ভুমিকা রাখে।
বিকল্প কি হতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরাসরি শিক্ষাগ্রহনের সাথে বর্তমান বিকল্প যে অনলাইন মাধ্যম তার আকাশ পাতাল পার্থক্য। আমরা অনলাইনে জুম ক্লাশসহ তিন পদ্ধতিতে ক্লাস নেই। এসব ক্লাসে শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগ শিক্ষার্থী একেবারেই অনুপস্থিত থাকে।এদিকে সরাসরি পাঠদানের মাধ্যমে যেভাবে শেখানো যায় সেভাবে অনলাইন পদ্ধতিতে কোন ভাবেই সম্ভব না। যতই বিকল্প খুজেন না কেন,সেটা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা দেওয়া যাবে না। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এই ক্ষতি থেকে শিক্ষার্থীদের বাচানোর কোন উপায় নেই।
তবে,পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এক্সট্রা ইফোর্ট দেবো।।এই ক্ষেত্রে শিক্ষকদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তরিক ভুমিকা পালন করতে হবে। বর্তমান বিকল্পে যতটা ক্ষতি কমানো যাবে তার থেকে বেশি ভুমিকা রাখবে স্বাভাবিক পরিস্থিতে এক্সট্রা ইফোর্ট। আমাদের এক্সট্রা ইফোর্টের দিকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শাহ মোহাম্মদ নিসতার জাহান কবির ইনিউজ৭১-কে বলেন, কোভিড কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে বেড়েছে বই কমেনি।এই অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তটা সময় উপযোগী। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু এই বিষয়ে বলেছেন, সেহেতু তিনি নির্দিষ্ট তথ্য- উপাত্তর উপর ভিত্তি করেই এমন সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন।তিনি তো আর এমনি এমনি এসব বলবেন না। যথেষ্ট বিশ্লেষণ করেই তিনি এসব সিদ্ধান্ত নেবেন। আমি মনে করি এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিকল্প হিসেবে তিনি বলেন, আসলে বিকল্প খুব একটা নেই যদিও। তবুও যারা শেষ ধাপে আছে, যেমন মাস্টার্স, অনার্স বা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে সীমিত পরিসরে ক্লাস রুম সেটাপে ধাপে ধাপে ক্লাস নিয়ে সেমিস্টার বা বর্ষ শেষ করে দেওয়া যেত। অটোপাস না দিয়ে বিধি মেনে পরীক্ষা নিলে খুব ভালো হতো।
যেমন শুধু পঞ্চম শ্রেনীর শিক্ষার্থীদের যদি তাদের নিজেদের স্কুলে স্বাস্থ্য বিধি মেনে নিরাপদ দুরুত্ব বজায় রেখে পরীক্ষাগুলো নেওয়া যেত তাহলে খুব বেশি অসুবিধা হতো না বলে মনে করি।যেদিন পঞ্চম শ্রেনীর ক্লাস হবে বা পরীক্ষা হবে সেদিন আর অন্য কোন কারো ক্লাস পরীক্ষা থাকবে না। একটা স্কুল কিন্তু বিশাল বড় এরিয়ায় হয়। এক ক্লাসের ক্লাস বা পরীক্ষায় জমায়েত বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তাই ক্ষতি হওয়ার সুযোগও নেই। ১০০ থেকে ১৫০ জনের জন্য স্বস্থ্যবিধি মানাটাও কঠিন কিছু না।
কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ক্লাস শুরু করে দেওয়ার মতো স্বাভাবিক পরিস্থিতি এখন নেই। এভাবে গণসমাগম বেশি হয়ে যাবে এবং তা হিতে বিপরীত হবে।
কথা হলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিরীণ আক্তার বলেন, ক্ষতি মানিয়ে নিতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে কিছুই বলা যাচ্ছে না। আর কিছুদিন যাক তখন বিবেচনা করা যাবে।
এমন অবস্থায় শুধু স্কুল-কলেজই নয় অনার্স পড়ুয়ারাও রয়েছেন নানামুখী চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। অল্পের জন্য থেমে আছে লাখ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের জীবন। বয়স বাড়লেও শিক্ষা জীবন শেষ না হওয়ায় কর্মহীন অবস্থায় বোঝা হয়ে আছেন পরিবারে। সব মিলিয়ে অন্ধকার একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তারা। যেখানে কোন পথের সন্ধান নেই। এমনটা জানা গেছে তাদের সাথে কথা বলে।
#ইনিউজ৭১/জিয়া/২০২১