
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৩, ১:৩১

প্রতিদিনই দক্ষিণাঞ্চল তথা বরিশাল বিভাগের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যবস্থায় নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। তবে এরইমধ্যে বরিশালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং একজনের মৃত্যু অনেকটাই ভাবিয়ে তুলেছে।
তবে বিভাগের কোনো হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা পরিমাপের যন্ত্র প্লাটিলেট সেল সেপারেটর নেই। তাই রোগীর রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা ২০ হাজারের নিচে নেমে গেলেই স্বজনদের ছুটতে হয় ঢাকায়। এতে সঠিক ও উন্নত চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীরা।
রক্তরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, জটিল ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় এক থেকে চার ব্যাগ পর্যন্ত প্লাটিলেট লাগতে পারে। যেসব রোগীর প্লাজমা লিকেজ দেখা দেয়, তাদের ক্ষেত্রে রক্ত পরিসঞ্চালন এবং ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এদিকে প্লাটিলেট সেল সেপারেটরের চাহিদা জানিয়ে গত বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েও পায়নি বরিশাল শেরেবাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাই ফের চলতি বছর প্লাটিলেট সেল সেপারেটর মেশিনের জন্য আবেদন করেছে হাসপাতালটি।
এছাড়া শেবাচিম হাসপাতালে ওই মেশিন চালানোর মতো প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় তা পরিচালনা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০২২ সালে প্লাটিলেট সেপারেটর মেশিন চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছিল, এবারও বিষয়টি জানানো হয়েছে, আশা করি দ্রুত মেশিনটি পাওয়া যাবে। তাতে পরবর্তীতে আর কোনো রোগীকে ঢাকায় পাঠাতে হবে না।
এদিকে বরিশাল বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৭৩ জন। সোমবার পর্যন্ত বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৭৪৮ জন রোগী। তবে গত রবিবার রেকর্ড ২৮৫ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ২৭৩ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়া রোগীর মধ্যে শুধু বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে ৬৪ জন ভর্তি হয়েছেন। ফলে এ হাসপাতালে বর্তমানে ২১৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। এছাড়া গত ২৪ ঘন্টায় বরিশাল জেলার অন্যান্য হাসপাতালে ৪০ জন, পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলায় ৫৩ জন, ভোলায় ৪০ জন, পিরোজপুরে ৩৯, বরগুনায় ২৫ ও ঝালকাঠিতে ১২ জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে এসব হাসপাতালে ৩ হাজার ৪৩০ জন রোগী ভর্তি হন। সুস্থ হয়ে ফিরেছেন ২ হাজার ৬৭৯ জন এবং শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনজন এবং ভোলায় একজন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়।

ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা:
বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও সদর হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগই মশারি সুবিধা পাচ্ছেন না। অন্যান্য রোগীদের মতোই মশারিবিহীন চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা। এতে করে রোগী ও তাদের স্বজনদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশা অন্য কাউকে কামড়ালে তিনিও ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে। তবে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইনসহ অন্যান্য ওষুধ পর্যাপ্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এছাড়া বিভাগের প্রতিটি জেলা ও সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য ডেঙ্গু কর্নার খোলা হয়েছে।
নেই লার্ভা শনাক্তের ব্যবস্থা:
বরিশাল বিভাগের হাসপাতালগুলোতে শুধু প্লাটিলেট সেল সেপারেট নয়, বিভাগের পৌরসভাগুলো ও একটি সিটি কর্পোরেশনেও নেই এডিস মশার লার্ভা শনাক্তের মেশিন। বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, মশক নিধনে আমরা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রোগ্রাম নিয়েছি। প্রতিদিন প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি টিম মশার লার্ভা শনাক্তে কাজ করেন। লার্ভা শনাক্ত হলে সেখানে হ্যান্ড স্প্রে ব্যবহার করে লার্ভা ধ্বংস করা হয়। এছাড়া বিকেলে ফগার মেশিন দিয়ে মশক নিধনে স্প্রে করা হয়। তিনি আরও বলেন, এডিস মশার লার্ভা শনাক্তে বরিশালে কোনো ল্যাব নেই। যে কারণে যেখানে যে ধরনের লার্ভাই পাওয়া যাক সেগুলো ধ্বংস করা হয়। দিনে পাঁচটি টিম ফগার মেশিন দিয়ে এবং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে একটি টিম লার্ভা ধ্বংস করতে হ্যান্ড স্প্রে নিয়ে অভিযান চালায়।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. খন্দকার মনজুরুল ইমাম বলেন, বিগত দুই বছর বরিশালে ডেঙ্গুর তেমন প্রকোপ ছিল না। এজন্য আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর) থেকেও কোনো প্রতিনিধি এ বছর আসেনি। গত দুই বছর যারা এসেছেন তারা বরিশালে এডিসের লার্ভা পাননি। এখন পর্যন্ত যারা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন তারা সকলেই ট্রাভেল পেশেন্ট। আক্রান্ত হয়েছেন ঢাকায়। ছুটিতে বাড়িতে এসেছেন। সেখানে অন্যরা সংক্রমিত হয়েছেন।
সিটি কর্পোরেশনের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. রবিউল ইসলাম বলেন, এডিসের লার্ভা শনাক্তে আমাদের ছোট ল্যাব ও কিট দরকার। কিন্তু বরিশাল সিটি কর্পোরেশন বা অন্য কোনো পৌরসভায় এই ল্যাব বা কিট আছে বলে জানা নেই। ল্যাব ও শনাক্তকরণ কিট খুব ব্যয়বহুল না হলেও আমারা পাচ্ছি না।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ বলেন, ২০১৯ সালে প্রথম ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয় বরিশালে। তারপর থেকে প্রতিবছরই ডেঙ্গুরোগী পাওয়া যাচ্ছে। এবারেও ঈদুল আজহার পর ডেঙ্গুর ব্যাপক বিস্তৃতি দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগ ও সচেতনতা প্রয়োজন। বিশেষ করে এডিস মশার বিস্তার রোধ, লার্ভা ধ্বংস করতে হলে সবাইকে সচেতন হতেই হবে। যেমন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে যেন নতুন কোনো মশায় না কামড় দেয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। কারণ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে যে মশা কামড়ে দেয়, সেটিও এডিসবাহী হয়ে বংশবিস্তার ঘটাতে পারে। এজন্য ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মশারির মধ্যে রাখতে বলা হয়। এছাড়া জমে থাকা পানি অপসারণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োজন, যা নিশ্চিত হলে মশার বংশবিস্তার রোধ হবে এবং আমরাও সুস্থ থাকবো।