
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৩, ১:১২

ঢাকা-কলকাতা ও আগরতলা-ঢাকা-কলকাতা রুটে সরাসরি চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাসগুলোর বর্তমানে নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকা ও কলকাতার চোরাকারবারিরা। বাসগুলো সরাসরি ঢাকা-কলকাতা চলাচল করায় বর্তমানে চোরাকারবারিদের নিরাপদ বাহনে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন এসব বাসে করে লাখ লাখ টাকার চোরাচালানের পণ্য আনা-নেওয়া হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি বাস সার্ভিসের স্টাফরা ডলার, টাকা, স্বর্ণসহ বিভিন্ন পণ্য পাচার করে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দুই সীমান্তে চুক্তির মাধ্যমে চলছে এ ব্যবসা। বাসের কেবিন, চালকের সিটের নিচসহ বিভিন্ন স্থানে আলাদা বক্স বানিয়ে এসব মালামাল পাচার করে থাকে।
শনিবার (৭ জানুয়ারি) বেনাপোল চেকপোস্টের বিপরীতে ভারতে পেট্রাপোল চেকপোস্টে বেনাপোল থেকে ছেড়ে যাওয়া কলকাতাগামী এন আর ট্র্যাভেলস শ্যামলী বাস থেকে ৩০টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করে ভারতীয় বিএসএফের ডগ স্কোয়াড বাহিনী। যার বাজারমূল্য দুই কোটি রুপির বেশি। জব্দ করা হয় বাসটি। আটক করা হয় বাসের চালক ও সুপারভাইজারকে। তল্লাশির সময় পালিয়ে যায় বাসের হেলপার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে ছয়টি বাস কলকাতা-ঢাকা ও আগরতলা-ঢাকা-কলকাতার মধ্যে সরাসরি যাতায়াত করে থাকে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় এন আর ট্র্যাভেলস শ্যামলীর দুইটি, টিআরটিএ (রয়েল)-এর একটি, গ্রিনলাইনের একটি ও সৌহার্দ্য পরিবহনের দুইটি যাত্রীবাহী বাস বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সরাসরি চলাচল করে থাকে। তবে সৌহার্দ্য এর দুইটির মধ্যে একটি নিয়ন্ত্রণ করে এন আর শ্যামলী ও অপরটি গ্রিনলাইন পরিবহন।

এ ছাড়া বর্তমানে ঢাকা-বেনাপোল-কলকাতা রুটে বিভিন্ন পরিবহনের আরো কয়েকটি বাস চলাচল করছে। তবে এগুলো সরাসরি নয়। কাটা গাড়ি হিসেবে পরিচিত। এসব বাসের যাত্রীরা বেনাপোল নেমে ওপার থেকে আবার ভারতীয় বাসে উঠে থাকে বলে এদের কাটা গাড়ি বলা হয়।
লাগেজ পার্টি নামধারী এক শ্রেণির ভদ্রবেশী চোরাচালানি প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার মালামাল পাচার করছে এসব পরিবহনের মাধ্যমে। বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রয়েছে এদের অবৈধ অর্থের লেনদেন। আর এসব করে থাকে অফিসের স্টাফ, বাসে থাকা সুপারভাইজার ও ড্রাইভাররা। এদের কাজগুলো দ্রুত করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে থাকে যাত্রীদের কাছ থেকে।

এ দেশ থেকে যেসব পণ্য পাচার হয়ে ভারতে যাচ্ছে এর মধ্যে রয়েছে স্বর্ণ, নগদ টাকা, ডলারসহ বিদেশ থেকে আমদানীকৃত ইলেকট্রনিক সামগ্রী। অপরদিকে ভারত থেকে এ দেশে আসছে ভারতের সোনার তৈরি বিভিন্ন অলংকার, মোবাইল সেট, প্রসাধনী সামগ্রী, শাড়ি, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, শার্টিং, বিছানার চাদর, বাচ্চাদের জামাকাপড়, ইমিটেশন সামগ্রী, ক্রোকারিজ ও নেশাজাতীয় বিভিন্ন প্রকার ওষুধ। বেনাপোল চেকপোস্টে কাস্টম ও বিডিআর সদস্যরা যৌথভাবে প্রতিদিন এসব বাসে ও যাত্রীদের ব্যাগ নামিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। লাখ লাখ টাকার চোরাই পণ্য আটকও করছেন। তার পরও কমছে না চোরাচালানি। পথে পথে এই বাস থামিয়ে বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক তল্লাশির কারণে যাত্রীরা মাঝেমধ্যে নাজেহাল হচ্ছেন।
শনিবার (৭ জানুয়ারি) সকালে আগরতলা থেকে ছেড়ে আসা কলকাতাগামী এন আর ট্র্যাভেলস শ্যামলীর ঢাকা (মেট্রো-১২-০৪৮৭) একটি বাস বেনাপোল চেকপোস্টে তল্লাশির পর ভারতে প্রবেশ করে। পেট্রাপোল চেকপোস্টে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাসটি ঘিরে ফেলে পেট্রাপোল ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা। পরে বিএসএফের ডগ স্কোয়াড বাহিনীর সদস্যরা বাসটিতে তল্লাশি চালিয়ে ৩০টি স্বর্ণের বার (ওজন ৩ কেজির বেশি) উদ্ধার করে। বাসের লাগেজ বগির ভেতর একটি ব্যাগ থেকে ওই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় বাংলাদেশের নাগরিক বাসের চালক মো. ফরহাদ ও সুপারভাইজার ওমর ফারুককে।
জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের দোষ স্বীকার করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা এ ধরনের চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের পেট্রাপোল থানায় সোপর্দ করা হয়।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কলকাতার নিউ মার্কেটের মো. জামাল নামে এক ব্যক্তির কাছে ওই স্বর্ণ নিয়ে আসা হচ্ছিল। বনগাঁ থেকে ট্রেনপথে শিয়ালদহ এবং সেখান থেকে গাড়িতে নিউ মার্কেট আসার কথা ছিল। নিউ মার্কেট থেকে এই স্বর্ণ সরাসরি মুম্বাইয়ে পাড়ি দেওয়ার কথা ছিল।
এ ব্যাপারে বিজিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কথা বলতে চাননি। যেহেতু স্বর্ণের চালান ভারতের মধ্যে আটক হয়েছে সে কারণে তারা কিছুই বলতে পারছেন না। এদিকে স্বর্ণ আটকের পরপরই বেনাপোল চেকপোস্ট এন আর ট্র্যাভেলস শ্যামলীর কাউন্টারের অনেকে গাঢাকা দিয়েছে বলে চেকপোস্ট সূত্রে জানা গেছে।