প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২১, ১৮:০
বৈশ্বিক মহামারী করোনায় গোটা বিশ্ব স্থবির। অন্যান্য ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দাভাব চললেও দেশের দক্ষিণাঞ্চল তথা বরিশালে রমরমা বাণিজ্য মাদক কারবারীদের। নগরীর বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মরণ নেশা ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও গাঁজাসহ নানা ধরণের মাদক। সহজে হাত বাড়ালে মাদকের দেখা মেলায় প্রায় সব বয়সী মানুষ মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ছে।
পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করোনা সংকট মোকাবিলায় মানবিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় মাদক কারবারীরা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেদার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আর পুরুষ মাদক কারবারীর পাশাপাশি নারীরাও জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে চলতি মাসে ১৮ তারিখ পর্যন্ত ৩৮ জন মাদক কারবারী আটক এবং বিপুল পরিমাণে মাদক উদ্ধার হলেও থেমে নেই মাদক কারবারীরা। এদিকে মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতি অনুযায়ী ছোট-বড়-মাঝারি কোন ধরণের মাদক কারবারীদের ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বরিশাল পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন খান (বিপিএম-বার)।
মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে এখন আর প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা না হলেও গোপনে বিভিন্ন কৌশলে মাদক বিক্রি চলছে বলে জানা যায়।
বর্তমানে বিভিন্ন বয়সী নারীরাও জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসায়। বরিশাল নগরীর মাদকের আখড়াখ্যাত পলাশপুর, কেডিসি, কাউনিয়া ছাড়াও আশেপাশের এলাকা মিলিয়ে রয়েছে শতাধিক মাদক ব্যবসার হটস্পট।
বিভিন্ন সূত্রের দেয়া তথ্য মতে, চিহ্নিত এলাকাগুলোতে পুলিশের তৎপরতার কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা কৌশল পাল্টানোর সাথে নতুন নতুন এলাকা বেছে নিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে, রায়পাশা কড়াপুরের সোনামিয়ার পোল, কালিজিরা নদীর পাড়, সোনারগাও টেক্সটাইল এলাকা, চরকাউয়া,
বিশ^বিদ্যালয় এলাকা, কাশিপুর ট্রাক স্ট্যান্ড, রুইয়ারপোল, ইছাকাঠী কলোনী, কাউনিয়া মতাসার, বাঘিয়া, আমিরগঞ্জ বাজার, কাশিপুর বিল্ববাড়ি, নিলখোলার পাড়, বাটনা, লাকুটিয়া মোহনগঞ্জ বাজার, সারশি, জাম্বুরাতলা, কাউনিয়া বরফকল ও বিসিকসহ বিভিন্ন এলাকা।
ওই সব এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা তৈরি করছে নতুন নতুন মাদকসেবী। বিশেষ করে উঠতী বয়সী যুবকরা জড়িয়ে পড়ছে মাদকের নেশায়। আর নেশার টাকা জোগাড় করতে নানা অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে তারা।
এখনই মাদকের আধিক্য বন্ধ না করা গেলে অচিরেই শেষ হয়ে যাবে শত শত যুবসমাজের জীবন। জানা গেছে, এলাকার অনেক স্কুলগামী তরুন-তরুনী থেকে শুরু করে বুড়োরা পর্যন্ত মাদকে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে অনেক পরিবারেই অশান্তি বেড়েই চলেছে।
সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে পারলে সমাজে অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে বলে মনে করেন সুশীল সমাজ।
মাদক ব্যবসায় জড়িত এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন আর মাদকসেবীরা পাড়া-মহল্লায় আসে না মাদক কিনতে। যারা নেশা করে তাদের কাছে আমাদের ফোন নম্বর রয়েছে। কল করলেই নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেয়া হয় মাদক। তবে এর জন্যে একটু বেশি দাম দিতে হয়।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার এক কর্মকর্তা জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আইজিপি মহোদয়ের মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুযায়ী কাজ করছেন তারা। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের বিরুদ্ধে তাদের অভিযানে বেশ কিছু সফলতা এসেছে।
চলতি মাসেই তাদের তৎপরতায় আটক হয়েছে অন্তত ৩৮ জন মাদক কারবারী। যাদের মধ্যে কিশোর, যুব ও বৃদ্ধ ছাড়াও নারী মাদক কারবারীরাও রয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ৩ কেজি ৮৭৫ গ্রাম গাঁজা, ইয়াবা ২৩৮১ পিস, ফেন্সি ৪৩ বোতল, ১২৪ পুরিয়া হেরোইন, ফান্টা বিয়ার ২০ পিস, বিদেশী মদ ১ বোতল।
এছাড়া মাদক বিক্রির নগদ ৫৭০০ টাকা এবং মাদকের কাজে ব্যবহৃত ১টি প্রাইভেট কার জব্দ করা হয়েছে। তবে আইনের ফাঁক ফোকড় গলে জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন মাদক কারবারীরা। এক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতির কথা বলছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিষ্টার প্রিন্স ইলাহী বলেন, যে কোন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাধারণত স্বাক্ষীর অভাবে মাদক মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতে দেরী হয়। তাই এ ব্যাপারে জনগণকে সহযোগিতা করতে হবে।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোঃ শাহাবুদ্দিন খান (বিপিএম-বার) বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে পুলিশ। তবে সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে হলে সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের সহযোগিতা ছাড়া পুলিশের একার পক্ষে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়।
এছাড়া মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতীদের নিয়মিত কাউন্সিলিং করা হয়। তবে সবার আগে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, “আপনার সন্তান কখন কোথায় যায়, কাদের সাথে মিশে এগুলো নজরদারী করতে হবে।”
পাশাপাশি সন্তানদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করার কথাও বলেন তিনি।