
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০১৯, ১:৫৫

১০ বছরে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের এমপি ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম-দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের মাধ্যমে নামে-বেনামে এসব সম্পদ বানিয়েছেন তিনি। জানা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হন মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। এরপর ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি সরকারি জমি ও এলাকার মানুষের সম্পত্তি লুটপাট করেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ তদন্ত এবং সম্পদের অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুদক। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দুদকের এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে এমপি রতনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
ধর্মপাশা উপজেলা সদরে তার আরও সাতটি বাড়ি রয়েছে। মোহনগঞ্জ উপজেলা সদরেও রয়েছে দুটি বাড়ি। নেত্রকোনা শহরেও একটি বাড়ি রয়েছে তার। নেত্রকোনা শহরে মা-বাবার নামে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকায় জমি কিনেছেন এমপি রতন। ঢাকার গুলশানের নিকেতনে তার নামে রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। সহোদর যতন মিয়ার নামে পাঁচশ একর জমি কিনেছেন এমপি রতন। সব মিলে ২৫টির ওপর বাড়ির রয়েছে তার। এরই মধ্যে গত বুধবার (২০ নভেম্বর) এমপি মেয়াজ্জেম হোসেন রতনের বিরুদ্ধে দুদকে আরেকটি অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান সোহেল।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দেয়া হলফনামায় তিনি ৫২৩ দশমিক ২৭ একর কৃষিজমি, ৮ দশমিক ২৬ একর পরিমাণের অকৃষি জমি, একটি অ্যাপার্টমেন্ট এবং নিজের ও অংশীদারিত্বের তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া সুনামগঞ্জ শহরের মল্লিকপুর এলাকায় ‘পায়েল পিউ’ বাড়ির সম্পত্তির পরিমাণ ৩৫ শতক। সেখানে একটি কলোনি রয়েছে। পুরো বাড়িটির চারপাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। ঢাকার সাভারে রয়েছে তার একটি বাড়ি। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌর শহরে রয়েছে ২১০ শতক জমি। সবমিলে ১০ বছরে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এমপি রতন।
পাশাপাশি সুনামগঞ্জের হাজিপাড়া এলাকায় দ্বিতীয় জিনাতুল তানভী ঝুমুরের নামে একটি বাড়ি রয়েছে। এর আগে ১০ মাস বিনা অনুমতিতে তাহিরপুর উপজেলার তরঙ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকায় রতনের দ্বিতীয় স্ত্রী সহকারী শিক্ষিকা ঝুমুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ১০ মাসে একদিন স্কুলে উপস্থিত ছিলেন এমপি রতনের স্ত্রী। দুদকে দেয়া অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, তাহিরপুর উপজেলার যাদুকাটা নদী, ফাজিলপুর, বড়ছড়া, বাগলী, সুলেমানপুর, ডাম্পের বাজার, আনোয়ারপুর, ঘাগটিয়া, জামালগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর, লালপুর, আহসানপুর, গজারিয়া, শুকদেবপুর এবং ধর্মপাশা উপজেলার শানবাড়ি পয়েন্ট থেকে বালু, পাথর, কয়লাবাহী নৌযান থেকে মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের লোকজন দৈনিক ৫০ হাজার টাকা চাঁদাবাজি করেন। যার অর্ধেকই পান এমপি রতন।
পাশাপাশি সুনামগঞ্জের বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন ও শ্রমিক নেতা সেলিম আহমেদ, ফয়সাল ও বাবুল আলীর মাধ্যমে চাঁদা তোলেন রতন। সুনামগঞ্জের শ্রমিক লীগ নেতা সেলিম আহমদ, নিজাম উদ্দিন চেয়ারম্যান, এমপি রতনের ভাই মোবারক হোসেন যতন ও ধর্মপাশা উপজেলার আজহারুল ইসলাম পিকে দিদার এবং রতনের প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে চাঁদার টাকা লেনদেন হয়।
এমপি রতনের নেতৃত্বে চাঁদাবাজির চক্র

তাহিরপুরে কয়লা আমদানিকারক গ্রুপ নামের প্রতিষ্ঠানটির ব্যানারে শত শত কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ অনেক দিনের। চাঁদাবাজির টাকা থেকে অর্জিত অর্থে এমপি রতনসহ তার চক্রের প্রায় সবাই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। চক্রের অন্যতম দুই সদস্য হলেন তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির সভাপতি আলকাছ উদ্দিন খন্দকার ও সচিব রাজেশ তালুকদার। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুদক ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সমিতির শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেন কয়লা আমদানিকারক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও এলাকাবাসীর পক্ষে সেলিম ইকবাল নামের এক ব্যক্তি।
এদিকে এমপি রতন অবৈধ অর্থ দিয়ে বড় ভাই মোবারক হোসেন মাসুদকে পাইকুরাটি বাজারে জায়গা কিনে একটি বাড়ি ও একটি সমিল করে দিয়েছেন। ছোট ভাই মোজাম্মেল হোসেন রুকনকে নওধারা গ্রামে একটি বাড়ি ও নেত্রকোনা শহরের বিজিবি ক্যাম্পের সঙ্গে চারতলা একটি বাড়ি করে দিয়েছেন। আরেক ছোট ভাই মোবারক হোসেন যতনকে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার হাসপাতাল রোডে জায়গা কিনে বাড়ি করে দিয়েছেন। পাশাপাশি ছোট বোন মিনা আক্তার ও শাকুরা আক্তারকে সুনামগঞ্জে বাড়ি করে দিয়েছেন। তার আরেক ছোট বোন আংরুজা আক্তারকে নেত্রকোনায় জায়গা কিনে বাড়ি করে দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, এমপি রতনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করায় তাহিরপুর থানা পুলিশের ওসি আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। এরপরও আমি থেমে যাইনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে যদি আমার মৃত্যু হয়, তাহলে সেই মৃত্যু হবে আমার জন্য আনন্দের।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, আমার বিরুদ্ধে দুদকে যে অভিযোগ দেয়া হয়েছে তা দুদক গ্রহণ করেছে কি-না তা দেখতে হবে। তবে এসব বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। সূত্র: জাগো নিউজ
ইনিউজ ৭১/টি.টি. রাকিব