
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২২, ২২:৪১

৫৩ জনকে অবৈধ পন্থায় নিয়োগ, ডিজিটাল যুগে এসে সিন্দুকে টাকা রেখে নগদ লেনদেনের পর এবার পুরাতন কাগজপত্র বিক্রিতে বিশ্ববিদ্যালয়কে ঠকানোর অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহালুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে। তার দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্তে দেশের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানটি ১৮ লাখ টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। ফলে এই ঘটনা জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহালুল হক চৌধুরীর স্বাক্ষরিত এক চিঠির মাধ্যমে মেসার্স আনজুম ট্রেডাস-কে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কাগজপত্র বিক্রির বিষয়ে অবগত করে চিঠি দেওয়া হয়। এই চিঠিতে বলা হয়, ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর তারিখের দরপত্রের প্রেক্ষিতে মেসার্স আনজুম ট্রেডাস-কে পরীক্ষার পুরাতন উত্তরপত্রের মূল্য প্রতি কেজি ২১.৫০ টাকা দরে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ১১/১২/২০১৮ তারিখে অনুমোদন হয়েছে।
এই পত্রে আরো বলা হয় ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) কেজি পুরাতন কাগজ এই ওয়ার্ক-অর্ডার-এর আওতায় থাকবে।সূত্র জানায়, চুক্তি মোতাবেক ১৩৬,৫৮৮ (এক লক্ষ ছত্রিশ হাজার পাঁচশত আটাশি) কেজি কাগজ মেসার্স আনজুম ট্রেডাস-এর নিকট বিক্রয় হয়। অবশিষ্ট কাগজ বিক্রয়ের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
কিন্তু বাজার দর যাচাই করে দেখা যায় যে,পুরাতন উত্তরপত্রের মূল্য প্রতি কেজি কমপক্ষে ৩৫/৩৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ এখানে দেখা যাচ্ছে যে, বাজারদরের চেয়ে কেজি প্রতি ১৪/১৫ টাকা কম হারে মেসার্স আনজুম ট্রেডাস-এর নিকট বিক্রি করা হয়েছে। এভাবে অন্যান্য পুরাতন কাগজের ক্ষেত্রেও গড়ে ১০/১২ টাকা কম দরে বিক্রি করা হয়। ফলে, ১৩৬,৫৮৮ (এক লক্ষ ছত্রিশ হাজার পাঁচ শত আটাশি) কেজি কাগজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮,৪৩, ৯৩৮ (আঠারো লক্ষ তেতাল্লিশ হাজার নয়শত আটত্রিশ) টাকা ক্ষতি হয়েছে। এদিকে ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) কেজি কাগজ বিক্রি করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কমপক্ষে ২,৭০০,০০০ (সাতাশ লক্ষ) টাকা ক্ষতি হবে।
কোনো ট্যাগ পাওয়া যায়নি
সরকারি বিধিমালা পর্যালোচনা করে জানা যায়, সরকারি নিয়মানুযায়ী স্টকে যতটুকু পুরাতন মালামাল থাকবে, শুধু ততটুকুই টেন্ডার করতে হবে। আগাম বিক্রয়ের টেন্ডার দেয়ার কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্র টেন্ডারের সময় স্টকের চেয়ে অনেক বেশী আগাম বিক্রির অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহালুল হক চৌধুরীর খামখেয়ালিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে উল্লেখ করে পুরাতন কাগজ ৩৫ (পঁয়ত্রিশ) টাকা কেজি ক্রয় করতে আগ্রহের কথা জানিয়েছে ভাই ভাই ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই লক্ষ্যে গত ৪ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বরাবর চিঠিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ভাই ভাই ট্রেডার্সের স্বত্তাধিকারী মো.সাইদুর রহমান স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে বলা হয়েছে, “ ২১/০৯/২০২২ইং তারিখে জানতে পারলাম যে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ অফিসে পুরাতন কাগজ বিক্রি হবে কিন্তু দুঃখের সহিত জানাচ্ছি যে, কোন এক কোম্পানী ২১.৫০ পয়সা দরে পুরাতন কাগজ গুলো ক্রয় করতেছে। ২১/১১/২০১৮ সাল থেকে ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) কেজি পুরাতন কাগজ নেওয়ার কথা কিন্তু অদ্য পযর্ন্ত তারা ঐ কোম্পানীকে ১,৩৬,৫৮৮ (এক লক্ষ ছয়ত্রিশ হাজার পাঁচশত আটাশি) কেজি পুরাতন কাগজ দিয়েছে।

আরো নাকি প্রায় তারা ৬১,০০০/- (একষট্টি হাজার) কেজি পুরাতন কাগজ পাবে। আমরা পুরাতন কাগজের মূল্যায়ন শুনে অবাক হলাম যে, তারা নাকি ২১.৫০ পয়সা দরে বিক্রি করে। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য খুবই ক্ষতিকর ও লোকসান হয়। এই কথা শুনে আমরা বললাম যে, আমার ভাই ভাই ট্রেডার্স এর পক্ষ হতে প্রতি কেজি ৩৫ (পঁয়ত্রিশ) টাকা বাজার দরে ক্রয় করতে আগ্রহী । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফান্ডকে তাদের ন্যায্য মূল্য দিতে আমরা ইচ্ছুক।অতএব,উপরোক্ত কথা গুলো সু-বিবেচনা করে পুরাতন কাগজ গুলো ভাই ভাই ট্রেডার্স-কে দিতে আপনার সু-মর্জি হয়।”
পুরাতন কাগজপত্র কেনার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে চিঠি দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ভাই ভাই ট্রেডার্সের স্বত্তাধিকারী মো. সাইদুর রহমান বিবার্তাকে বলেন, এটা সত্যি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এ বিষয়ে আমরা চিঠি দিয়েছি। আর চিঠিতে আমরা সার্বিক বিষয়ে উল্লেখ করেছি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আমাদের কিছুই জানায় নাই।এ চিঠি পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ বিবার্তাকে বলেন, আমি এই চিঠি পেয়েছি। পরে এ বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসকে ফাইল পাঠাতে বলেছি। গতকাল তারা ফাইল পাঠিয়েছে। তবে এরমধ্যে আমি গরমিল দেখেছি।
পুরাতন কাগজপত্র বিক্রির টেন্ডারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেখুন- এই টেন্ডার আমি কোষাধ্যক্ষের দায়িত্বে আসার আগে হয়েছে। শুনেছি এটা নিয়ে একটা কমিটি করা হয়েছিল। তারা কিভাবে কী করেছে, সেটা আমি বলতে পারবো না। তবে এতোটুকু আমি বলতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, এমন কোন কাজ আমাদের করা উচিত নয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কাগজপত্র বিক্রির জন্য অগ্রীম অনুমোদন দিতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, এটা পারে না। স্টকে যা থাকে তার অনুমোদন দেয়া হয়।
পুরাতন কাগজপত্র বিক্রিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতির বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. বাহালুল হক চৌধুরী বিবার্তা২৪ডটনেটের পক্ষ থেকে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি অভিযোগের বিষয়বস্তু উল্লেখ করে তার মুঠোফোন নাম্বারে মেসেজ করলেও তিনি কোন সাড়া দেননি।
সার্বিক বিষয়ে অবগত করে মন্তব্য জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বিবার্তাকে বলেন,বিষয়গুলো সংশ্লিষ্টরা দেখবে। যাদের দেখার বিষয় তারা দেখবে। আর এটা দেখতে হবে। খোঁজ নিতে হবে। এটা ট্রেজারার অফিস এবং হিসাব পরিচালক অফিসসহ যারা সংশ্লিষ্ট আছেন তাদের-ই তো দেখার বিষয়। আমি তাদেরকে বলবো বিষয়টা দেখতে।