
প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২১, ২৩:৩৭

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ নামে একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত শিশু ও নারীসহ অন্তত ৪০ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে ২ শতাধিক এবং লঞ্চ থেকে নদীতে ঝাপ দিয়ে অনেকেই নিখোঁজ রয়েছে যাদের সঠিক পরিসংখ্যাণ নেই ও তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তাও অনিশ্চিত। তবে এ পর্যন্ত ৩৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার শহিদুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন মৃতদের নাম পরিচয় এখনো জানা যায়নি। তাদের সাথে একযোগে পিরোজপুর, বরিশাল, বরগুনা ও ঝালকাঠির কোস্টগার্ড সদস্যরা কাজ করছেন। এ ঘটনায় ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনটি কমিটি করা হয়েছে।
জানা গেছে, অভিযান নামক লঞ্চটি ঢাকা থেকে বরগুনা যাওয়ার পথে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর দপদপিয়া এলাকায় আসলে বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ইঞ্জিন কক্ষ থেকে আগুন লাগে। পরে আগুন নিয়েই লঞ্চটি প্রায় একঘন্টা চালিয়ে সদর উপজেলার দিয়াকুল এলাকায় গিয়ে নদীর তীরে নোঙর করে। খবর পেয়ে ঝালকাঠির ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ঝালকাঠির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মইনুল হক জানান, শতাধিক দগ্ধ যাত্রীকে ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল ও বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম জানান, ভোররাত থেকে এ পর্যন্ত অগ্নিকান্ডে দগ্ধ ৭২ জনকে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের শরীরের ৮০ ভাগ পুড়ে গেছে। এছাড়া আরও বেশ কয়েকজনের ৫০ ভাগ পুড়েছে। ৫০ থেকে ৮০ ভাগ দগ্ধ ২০ জনের মতো রোগী রয়েছেন। তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।
শেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন লঞ্চযাত্রী সোলাইমান আকন বলেন, ‘হঠাৎ বিকট শব্দে লঞ্চে আগুন ধরে যায়। লঞ্চের পেছনের অংশ থেকে তৃতীয় তলার সামনে পর্যন্ত আগুন ছড়িয়ে পড়ে।’
সাইদুল ইসলাম নামের আরেক যাত্রী জানান, লঞ্চে অগ্নিকান্ডের পর যাত্রীদের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রাণ বাঁচাতে অনেকেই লঞ্চ থেকে নদীতে লাফ দেন। লঞ্চের কেবিন বয় ইয়াসিন তাৎক্ষণিক জানান, লঞ্চে প্রায় ৫ শতাধিক যাত্রী ছিল। বেশিরভাগ যাত্রী নদীতে লাফ দিয়েছে এবং যারা ঘুমন্ত ছিলেন তাদের বেশিরভাগ মারা গেছেন।
ওই লঞ্চে থাকা পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসাইন মোহাম্মদ মুজাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, অফিসের কাজে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন তিনি। কাজ শেষে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এমভি অভিযান-১০ লঞ্চের ভিআইপি কেবিনের নীলগিরিতে ওঠেন তারা। রাত তিনটার দিকে লঞ্চে অন্য যাত্রীদের চিৎকারে তার ঘুম ভাঙে। অবস্থা বেগতিক দেখে স্ত্রীকে নিয়ে তিনি লাফ দেন নদীতে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় দুজনে প্রাণে রক্ষা পেলেও তার স্ত্রীর ডান পা ভেঙে যায়। বর্তমানে তারা দুজন’ই ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনাস্থলে ছুটে আসা ঝালকাঠি পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হুমায়ুন কবির সাগর বলেন, রাত আনুমানিক ৪টার দিকে লঞ্চে অগ্নিকা-ের ঘটনা শুনে ৪টি ট্রলার নিয়ে লঞ্চের দিকে গেলেও আগুনের তাপের কারণে লঞ্চের কাছে যেতে পারছিলাম না। এরই মধ্যে অনেক যাত্রী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ট্রলারের দিকে সাঁতরে আসেন। এভাবে দেড়শ যাত্রীকে আমরা তীরে নিয়ে আসি।
এদিকে যাত্রীবোঝাই লঞ্চে অগ্নিকান্ডে দগ্ধদের উদ্ধার করে পাঠানো হয় বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তবে হাসপাতালের বার্ন ইউনিট বন্ধ থাকায় চিকিৎসা চলে সার্জারি বিভাগে। একসঙ্গে এত রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসকদের। চিকিৎসাধীন রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, সার্জারি বিভাগে অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সরাই রোগীদের একমাত্র ভরসা। সরেজমিনে দেখা যায়, সার্জারি ওয়ার্ডে আগে থেকে অনেক রোগী ভর্তি থাকায় দগ্ধদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

অপরদিকে উন্নত চিকিৎসা দিতে ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট থেকে চারজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসককে দুপুরে বরিশালে পাঠিয়েছে। শুক্রবার (২৪ ডিসেম্বর) মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে দগ্ধদের দেখতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল জাহিদ ফারুক শামীম এমপি। নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের হিসাবমতে লঞ্চে ৩৫০-এর মতো যাত্রী ছিল। এর বেশি থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে। তা ছাড়া লঞ্চের ফিটনেস ঠিক ছিল বলে জানতে পেরেছি।’ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে কোনো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা এখনই বলতে পারছি না। লঞ্চের ব্যবসা কারা করে আপনারা সবাই জানেন। শেখ হাসিনার পরিবার লঞ্চের ব্যবসা করে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ঘটনায় মৃত সবার পরিবারকে দেড় লাখ টাকা দেয়া হবে।’
অপরদিকে অগ্নিদগ্ধদের খোঁজখবর নিয়ে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন বরিশাল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পার্বত্য শান্তি চুক্তি কমিটির আহ্বায়ক আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, বরগুনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমান রিমন ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ। দুপুরে তারা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
এদিকে অগ্নিকা-ে গুরুতর আহত চিকিৎসাধীন তাইফা (১০) নামক শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। তাইফার মামা বনি আমিন জানান, লঞ্চে আগুনের ঘটনায় তার ভাগ্নি তাইফা ও দুলাভাই দগ্ধ হয়। পরে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থা খারাপ হওয়ায় ভাগ্নিকে নিয়ে সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন তিনি। কিন্তু বেলা ১১টার দিকে অ্যাম্বুলেন্স নগরীর আমতলার মোড়ে এলে মারা যায় তাইফা।
এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে পরিদর্শনে এসেছেন র্যাবের ডিজি এডিশনাল আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন। হেলিকপ্টারযোগে তিনি ঢাকা থেকে বরিশালে আসেন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের খোঁজখবর নেন।
এদিকে শয্যা ফাঁকা না থাকায় শেবাচিম হাসপাতালে মেঝেতে অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসা দেয়া হলেও শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে ৩০ জনকে হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। বাকিরা সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের সহায়তায় কাজ করছে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের খাবার ও কম্বল দিচ্ছে তারা।