
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২১, ২১:৩০

এক হাতে বড় পাতিল এক অন্য হাতে পলিথিনের প্যাকেট। পাতিলের ভিতরে রান্না করা খিচুরি। দুই বন্ধু সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত নওগাঁ শহরের বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় ছুটে চলছেন। প্রথমে দেখলে মনে হবে ফেরি করে খাবার বিক্রি করছেন। কিন্তু তা নয়। রাস্তায় ক্ষুধার্ত কুকুরদের প্রতিদিন খাবার বিলিয়ে বেড়ায়। কুকুদের প্রতি তাদের যেন এক অন্য রকম মায়া ও ভালোবাসারই বহি:প্রকাশ।
করোনা নিয়ন্ত্রনে সারাদেশের ন্যায় নওগাঁয় চলছে লকডাউন। বিশেষ বিধিনিষেধ এর মধ্যে স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। হোটেল-রেস্তোরা ও খাবারের দোকান সহ সকল দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। গত ১ জুলাই থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে এ বিধিনিষেধ আরোপ করে। হোটেল-রেস্তোরাসহ খাবারের দোকান বন্ধ থাকায় খাবারের জন্য হন্য হয়ে ঘুরছে বেয়ারিশ কুকুর। ময়লার ভাগাড়েও মিলছেনা খাবার। খাবার না পেয়ে অভুক্ত থাকা কুকুরগুলো অনেকটা ক্ষিপ্রতা আচরণ করছে।
করোনার এ ক্রান্তিলগ্নে অনেকেই মানবিকতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। নিজের সাধ্যের মধ্যে প্রতিবেশিসহ বিভিন্ন জনকে সাহায্য সহযোগীতা করছেন। এমন সংকটকালের মধ্যেও পশুদের প্রতি মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন দুই বন্ধু জাহাঙ্গীর আলম স্বপন ও জাহিদ হাসান। নিজেদের অর্থায়নে গত ১ জুলাই থেকে শহরের বিভিন্ন স্থানে বেয়ারিশ কুকুরগুলোকে খিঁচুড়ি রান্না করে খাবার দিয়ে যাচ্ছেন। পশুদের প্রতি তাদের এমন ভালোবাসাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
প্রতিদিন সকালে তিন থেকে চার কেজি চাউল, পরিমান মত ডাল, সবজি,তেল ও যাবতীয় মসলা দিয়ে খিঁচুড়ি রান্না করেন । এতে করে প্রতিদিন খরচ পড়ে ৪০০টাকার মত। এর পর রান্না করা খিচুরি এক হাতে খাবারের পাত্র ও আরেক হাতে কাগজের টুকরো ও পলিথিন নিয়ে বেরিয়ে পড়েন দুই বন্ধু। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শহরের তাজের মোড়, উকিলপাড়া, বিহারীকলোনী, উত্তরা স্কুল মোড়, কেডির মোড়, মুক্তির মোড় ও বিজিবি ক্যাম্প মোড় সহ বিভিন্ন মোড়ে পলিথিনের উপর কাগজের টুকরো পেতে তাতে খিঁচুড়ি দিয়ে কুকুরদের খাবার দেন। খাবারের পাত্র দেখে ছুটে আসে কুকুর। কুকুররা।
কুকুর প্রেমী শহরের উকিলপাড়ার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম স্বপন বলেন, কুকুররা যখন খায় পেট ভরে কতটা যে মনে তৃপ্তি অনুভব করি তা বোঝাতে পারবোনা। আমি একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করি। করোনা কারনণ মানুষের আয় রোজগার কমে গেছে। জীবন বাঁচাতে মানুষ ধারদেনা করে চলছে। দীর্ঘদিন থেকে হোটেলসহ খাবারের দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। শহরের রাস্তায় যে কুকুরগুলো আছে তাদের খাবারে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ময়লার ভাগাড়ে খাবারের জন্য হন্য হয়ে খুঁজছে। কুকুরদের কষ্ট দেখে ব্যথিত হয়। এমন চিন্তা থেকেই এক বেলা খাওয়ানো উদ্যোগ নিয়েছি। আগামীতেও এমন উদ্যোগ অব্যহত রাখবো।

তিনি আরো জানান, কুকুরদের যে খাবার দেওয়া হয়ে থাকে। তা সম্পূর্ন আমাদের নিজ অর্থায়নে। এ ব্যাপারে কারো কাছ থেকে সহযোগীতা নেয়নি বা কাউকে কিছু বলিনাই। তবে কেউ যদি একান্ত সহযোগীতা করতে চান তাহলে তিনি যেন তার এলাকার প্রাণীদের এক বেলা খাবার দেন এটাই প্রতাশা করি। কারণ পশুরা কারো কাছে চাইতে পারে না বা কিছু বলতে পারে না। তাদেরও পেট আছে ক্ষুধা লাগে এমন অনুভব থেকই এমনটা করছি।
কুকুর প্রেমী তার আরেক বন্ধু জাহিদ হাসান এর সাথে কথা হলে তিনি বলেন, কুকুরদেরও জীবন আছে। তাদের খাবারের প্রয়োজন হয়। করোনার এই সময় কুকুরগুলো চরম খাদ্য সমস্যায় পড়েছে। আমরা ক্ষুদ্র প্রয়াসে চেষ্টা করেছি কুকুরদের একবেলা খাওয়ানো। নিজে খাওয়া যাবে এমনভাবে রান্না করা হয়। রান্না করে শহরের বিভিন্ন স্থানে নিজে গিয়ে খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করি। প্রতিদিন ২০-২৫টি কুকুরকে খাবার দেওয়া হয়। খাবার নিয়ে যাওয়ার পর কুকুরগুলো ছুটে আসছে। এর চেয়ে ভাল লাগা আর কি হতে। কুকুরদের পাশে দাঁড়াতে পেরে নিজেও পরম প্রশান্তি অনুভব করছি।
নওগাঁর লেখক,কলামিষ্ঠ ও মুক্তিযোদ্ধা এবিএম রফিকুল ইসলাম জানান, রাস্তার ক্ষুধার্ত কুকুদের খাওয়ানো এটা অনেক বড় মহৎ কাজ। যা সবাই করতে পারেনা। ওই দুই বন্ধুর প্রতি অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বর্তমান এই সময়ে মানুষ নিজেদের জন্যই ব্যস্ত। কিন্তু তারা কুকুদের প্রতি যে ভালোবাসা দেখিয়ে তা আসলেই একটি মহৎ উদ্যোগ। তাদের জন্য শুভ কামনা রইলো। সমাজের সকলের উচিত পশুদের প্রতি ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়া। সবার উচিত সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা দেখানো।
স্থানীয় সামাজিক সংগঠন একুশে পরিষদের সাধারন সম্পাদক মোস্তফা রাসেল বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণে মানুষের চলাফেরা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হচ্ছে। হোটেল-রেস্তোরা গুলো বন্ধ রয়েছে। যেখান থেকে উচ্ছিষ্ট খাবার গুলো জুটতো কুকুরের জন্য। কিন্তু সব কিছু বন্ধ। মানুষতো মানুষের সহযোগিতায় জীবন পার করছে। কিন্তু কুকুর বোবা প্রাণী। খাবারের অভাবে কুকুর গুলো দূর্বল কিংবা হিং¯্র হচ্ছে। ঠিক এমন সময় দুই তরুন বেশ কিছুদিন ধরে রাস্তার কুকুরগুলোর জন্য খাবার সরবরাহ করে চলেছে। তাদের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তাদের জন্য শুভ কামনা।