প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান (ইভি) উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক সহযোগিতায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের প্রস্তুতি চলছে। সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই সফরে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে সবুজ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ইভি উৎপাদনে সহযোগিতা চাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের বিদেশ সফর শুরু হবে মালয়েশিয়া দিয়ে। মালয়েশিয়া সফর শেষ করে তিনি সেখান থেকে সরাসরি চীন সফরে যাবেন। ২২ জুন রাতে মালয়েশিয়া থেকে তিনি ও তাঁর সফরসঙ্গীরা চীনের উদ্দেশে রওনা দেবেন এবং বেইজিং পৌঁছাবেন।
সফরে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেবে। এতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্র সচিবসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা।
সফরের প্রথম বড় কর্মসূচি হিসেবে ২৩ জুন চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্সে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ২৪ জুন বিকেলে তিনি বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন। ঢাকা-বেইজিং কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী দালিয়ান থেকে বুলেট ট্রেনে সফরসঙ্গীদের নিয়ে বেইজিং যাবেন, যা সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সফরের সময় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান উৎপাদন, অর্থনৈতিক অঞ্চল, অবকাঠামো ও আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বুধবার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে সফরের কর্মসূচি, আলোচ্যসূচি, সম্ভাব্য চুক্তি এবং সমঝোতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
এই সফরকে কেন্দ্র করে বেইজিংয়ে একটি বড় বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে। উদ্দেশ্য হলো চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ইভি খাতে সহযোগিতা। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, চীন ইতোমধ্যেই বৈশ্বিকভাবে সবুজ জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যান প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশও জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহী।
এ কারণে একটি প্রস্তাবিত সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে ইভি উৎপাদন শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, চীনকে বাংলাদেশের চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের ডেভেলপার হিসেবে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনকে (সিআরবিসি) নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা হান্ডা গ্রুপের বিনিয়োগের জন্য জমি বরাদ্দের চুক্তিও প্রস্তুত রয়েছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ৩০ শতাংশ এবং চীনের ৭০ শতাংশ অংশীদারিত্ব থাকবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এটিকে একটি সুপরিকল্পিত কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছে।
ইআরডির তুলনামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলের ক্ষেত্রে জাপানকে ৭৬ শতাংশ এবং বাংলাদেশকে ২৪ শতাংশ ইক্যুইটি দেওয়া হয়েছিল, যা দেশের কৌশলগত আর্থিক স্বার্থের জন্য কম সুবিধাজনক ছিল বলে অভিমত দেওয়া হয়।
চীনা বিনিয়োগ প্রসারে বাংলাদেশ সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই), ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং গ্রিন মাইনিং অ্যান্ড মিনারেলস উদ্যোগে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করবে।
এছাড়া চীনা মুদ্রায় ‘পান্ডা বন্ড’ চালুর বিষয়েও বাংলাদেশ পর্যালোচনা করছে। সম্প্রতি চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইআরডির সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছে।
চীন দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), মুদ্রা অদল-বদল (কারেন্সি সোয়াপ), বাংলাদেশে চীনা ব্যাংক স্থাপন এবং বিনিয়োগ চুক্তি আধুনিকায়নের প্রস্তাবও দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, এই সফরকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যেখানে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং আর্থিক খাতে বড় ধরনের সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।