
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৮

বাংলাদেশের সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় পরবর্তী কিস্তি ছাড়ে অনীহা প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়েছে, নির্ধারিত সংস্কার বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকায় জুনের মধ্যে অর্থছাড় সম্ভব নয়। এর বদলে নতুন শর্ত সংযুক্ত করে একটি সংশোধিত ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে তারা।
ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক-এর বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠকে সংস্থাটি গত দুই দিনের আলোচনায় তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বর্তমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় জুনের মধ্যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার আশা করছিল বাংলাদেশ। তবে আইএমএফ জানিয়েছে, এই অর্থ নির্ধারিত সময়ে ছাড়া হবে না। ফলে অর্থবছরের শেষ প্রান্তে এসে সরকারের আর্থিক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আইএমএফের মতে, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো বাস্তবায়নে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ে তারা আগ্রহী নয় বলে জানানো হয়েছে।
এছাড়া ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক আইন সংশোধন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। বিশেষ করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পুরনো মালিকদের ফেরার সুযোগ দেওয়া এবং আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাজেটের অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছে আইএমএফ। তাদের মতে, এসব ক্ষেত্রে বিকল্প আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান-এর মধ্যকার চলমান সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত অর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ আইএমএফ ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে সহায়তা চাইছে।

তবে আইএমএফের কঠোর অবস্থানের কারণে বিকল্প উৎস হিসেবে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা বাড়াচ্ছে সরকার। সহজ শর্তে অর্থায়নের সম্ভাবনা খুঁজে দেখছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল, যাতে জ্বালানি ব্যয় ও বাজেট ঘাটতি সামাল দেওয়া যায়।
আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বড় ধরনের সংস্কার জরুরি। তার মতে, রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়া এবং আর্থিক খাতে দুর্বলতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতে কার্যকর সংস্কার এবং বিনিময় হার বাস্তবসম্মত করা ছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে। তারা সতর্ক করেছেন, চলমান কর্মসূচির শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, অতীতে বহু ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক ঋণ কর্মসূচির শেষ কিস্তি পেতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। তার মতে, এবারও যদি একই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে বিদেশি সহায়তা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠবে।