প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২১, ১৮:৩৩
‘আট-দশ বছর আগে একটা লোন করছিলাম। প্রত্যেক বছর রিকোভারি কইরা আই। ওই লোনডা দিয়া (পরিশোধ করে) আবার নতুন কইরা আনি। আনতে আনতে আমার নামে একটা লোন থাকপে। কিন্তু পিছনে আরো দুইডা লোন রইছে য্যা পরিশোধ করে নাই। আমি যে টাকা দিয়া আইছি সে টাকাও পরিশোধ করে নাই। আগের এনেসপেক্টর (মাঠ কর্মকর্তা) আছিলে উনি ওই টাকাটা আত্মসাত করছে। কথাগুলো বলছিলেন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার সেনেরহাওলা গ্রামের ভুক্তভোগী জিয়াউল হক।
তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক বাহেরচর শাখার একজন নিয়মিত গ্রাহক।
এসময় তিনি আরও বলেন, আমার কাছে রিসিভ আছে জমা দিছি ৪৭ হাজার ৭শত ৭৫ টাকা। আমি দিছি অথচ আরেকজনের নাম দিয়া আমার ঋণের খাতায় মাত্র ৫০ টাকা জমা কইরা থুইছে। বর্তমান যে এনেসপেক্টর আছে তিনি আমারে ফোনদিয়া কইলো আপনি লোন করছেন কয়ডা?
আমি কইলাম একটা, সে কইল -আপনার নামে লোন হইয়া রইছে তিনডা। আপনি ব্যাংকে আন (আসেন)। আইয়া দেহি কথা সত্য কোন টাকা আমার নামে জমা হয়নাই। বরং আমার বাড়তি দুইডা লোন রয়েছে।’
জানাগেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক বাহেরচর বন্দর শাখার সাবেক কর্মকর্তা (মাঠ) মোঃ আনিসুর রহমান গত বছরের মার্চ মাসে বাহেরচর বন্দর শাখা হতে বদলি হয়ে পার্শ¦বর্তী উপজেলা গলাচিপা শাখায় যোগদান করেন। বাহেরচর শাখায় কর্মরত অবস্থায় গ্রাহকের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে একাধিক অভিযোগ উঠে।
এমনকি গ্রাহকের অজান্তে তিনি ক্ষুদ্র ঋণের লোন পরিশোধ করে ওই গ্রাহকের নামে মোটা অঙ্কের ঋণ করে টাকা হাতিয়েছেন বলে দাবি অধিকাংশ গ্রাহকের। এমন ঘটনায় চলতি বছরে মে মাসের ১৭ তারিখ জিয়াউল হক নামের ওই গ্রাহক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উপ-মহাব্যবস্থাপক( ভিজিলেন্স স্কোয়ার্ড ও ব্যবসা উন্নয়ন বিভাগ), বরাবর বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ডাকযোগে অভিযোগ করেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ১০ বছর আগে থেকে ঋণ গ্রহণ করে এসেছেন জিয়াউল। চলতি বছরের ৬ এপ্রিল কৃষি ব্যাংকের পূর্বের টাকা পরিশোধ করে নতুনভাবে ৪% সুদে ঋণ গ্রহণের সুবিধার জন্য আসেন এবং দেখতে পান পূর্বের ঋণের টাকা জমা করা হয়নি। এবং তার পরিশোধকৃত ৪৭ হাজার ৭শত ৭৫টাকা রশিদ থাকা সত্ত্বেও জমা করা হয়নি। যাহার জমা রশিদ নম্বর-১৮৮৫২৩৫, হিসাব নম্বর-১৮৮(১৪৭)।
পরে বর্তমান মাঠ কর্মকর্তার সাথে আলাপ করেন। সে তাকে সাবেক মাঠ কর্মকর্তা মোঃ আনিসুর রহমানের সাথে আলাপ করার জন্য বলেন। এবং তার সাথে জিয়াউল হক আলাপ করলে তিনি বলেন, সে এ ধরনের অনিয়ম করেননি। বরং উল্টো তাকে শাসানো হয়। এরপর সে ওই অঞ্চলের মূখ্য আঞ্চলিক ব্যবস্থাপকের সাথে টেলিফোনে আলাপ করেন। মূখ্য আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দেন। কিন্তু কোন সমাধান হয়নি।
খোঁজ নিয়ে আরও জানাগেছে, শুধু জিয়াউল হকই নয় উপজেলা চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের চিনাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন চৌকিদার ২০০১ সনে ১৪ হাজার ৫শত টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। পরে পহেলা মে ২০০৫ সালে ৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। এবং পরে ১০ হাজার টাকা জমা রশিদ বুঝিয়া নেয়। কিন্তু এখনও তার কাছে ২০ হাজার ৮ শত ৬০ টাকা পাওনা দেখানো হয়।
উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের গাবুনিয়া গ্রামের আরেক গ্রাহক মোহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান বলেন, ২০০০ সনে আমার বাবা আব্দুর রাজ্জাক মিয়া ৫ হাজার টাকার একটি ক্ষুদ্র ঋণ গ্রহণ করেন। পরে দুই কিস্তির মাধ্যমে ২০০৫ সালে সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করিয়া দেন। এবং আমাদের সমস্ত ডকুমেন্ট আমরা বুঝিয়া নেই। কিন্তু ২০১৭ সালের দিকে আমার বাবার নামের ওই ঋণ পরিশোধ করার জন্য নোটিশ প্রদান করা হয়। পরে আমরা ব্যাংকে উপস্থিত হইয়া আমাদের কেস ফাইল চাইলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা দেখা ব্যর্থ হন।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নে টুঙ্গিবাড়িয়া এলাকার কাশেম মাতবরের ছেলে ফারুক মাতবরের মাতবর নামে ৩৫ হাজার টাকার একটি ঋণ দেখানো হয়েছে। অথচ এই নামে কোন ব্যক্তিকে খুঁেজ পাওয়া যায়নি। এরকম অনেক গ্রাহকের টাকা পরিশোধ না করে তিনি আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগ করেন।
তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন, আমার সাথে যে সমস্যা ছিলো সেই ৬০ হাজার টাকা আমি দিয়ে দিছি, জমা হইয়া গেছে। কি সমস্যা ছিলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্থাৎ যে রশিদ কাটার সাথে সমস্যা ছিলো সেইটা আমি জমা দিয়া দিছি। কিন্তু বাকি যে তার লাস্ট লোন প্লাস প্রথম লোন এ সর্ম্পকে আমার নলেজে নাই। কারণ বিশাল ইউনিয়ন। আর সমস্যাটা হলো ভাউচার কাটা নিয়া এটার অনেক ব্যাখা আছে। আপনি কখনো গলাচিপায়(বর্তমান কর্মস্থল) আসলে সামনা সামনি বলবো। কারণ রশিদ কাটার পর যে প্রক্রিয়া লেনদেনটা হয় এটা ফোনে আপনাকে ব্যাখা দিতে পারবো না। কাইন্ডলি যদি সামনাসামনি হই তবে আপনাকে বুঝাইয়া বলমু।
এ ব্যাপারে বাহেরচর বন্দর শাখা ব্যবস্থাপক মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন, আমারে যে জিজ্ঞেস করছেন আমি ভালো জানিনা আমার চাকরি শেষের দিকে আগামী রবিবার-সোমবার আমার কর্মস্থল ত্যাগ। তবে আমি শুনছি যে জিয়াউল হকের নামে ৩ ডা লোনের ১টা ক্লোজড হইছে আর দুইডা আছে। আর এব্যাপারে ভালো ইব্রাহিম সাব (বর্তমান ইন্সপেক্টর) কইতে পারবে। ইব্রাহিম সাইবেও হ্যারে আইতে বলছেলে, হে তো আসেনাই ।