
প্রকাশ: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ৪:১৭

১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ আর দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। দীর্ঘ ৯ মাস হানাদার বাহিনী, রাজাকার আর আলবদরদের বিরুদ্ধে ত্রিমুখী লড়াইয়ে শেষ হাসি আমাদের বীর বাঙালীরাই হেসেছিলেন। তবে সেই হাসি স্লান করে দিতে এদেশেরই নির্লজ্জ ও ক্ষমতালোভী রাজাকার ও আলবদররা হাত মিলিয়ে ছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই আহবান ‘তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাপিয়ে পড়, এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম” মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার চেতনায় টগবগে রক্ত দাবিয়ে রাখতে পারেনি হানাদার বাহিনী। সত্যি হয়েছিল জাতির পিতার ভবিষ্যত বানী যা তিনি পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন ‘আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না”। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানরা অর্জন করেছিলেন বিজয়। আর সেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে পৃথিবীর বুকে নতুন একটি দেশের অভ্যুদয় হয়েছিল যার নাম বাংলাদেশ। বিজয়ের এই দিনে স্বশ্রদ্ধ সালাম এই মহান নেতার প্রতি। বিনম্র শ্রদ্ধা আর গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।
’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয়, ’৫৭-র স্বায়ত্তশাসন দাবি, ’৬২ ও ’৬৯-এর গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। দীর্ঘ নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ভেতর দিয়ে, বহু ত্যাগ-তিতীক্ষা, বহু নারীর সম্ভ্রম আর শহীদদের অমূল্য জীবনের বিনিময়ে অর্জিত এ বিজয়। এ বিজয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালেই তাঁকে গ্রেফতার করা হলেও প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার হৃদয়ে, আবেগে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ছিল এ মহান নেতার। একাত্তরের অগ্নিঝরা ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন- এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার যে উদাত্ত আহ্বান বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয়েছিল- তা আজ ও বাঙালির ধমনিতে শিহরণ জাগায়। ৭ মার্চে বাঙালির বুকে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র বোনা হয়ে যায়। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছিলেন, “যার যা আছে, তা-ই নিয়ে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো”। তার ঐতিহাসিক আহ্বানে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সেই তেজোদ্দীপ্ত ভাষণ বাঙালির চেতনায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছিল এবং জাতি, ধর্ম, দলমত নির্বিশেষে ঐক্যের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। যে ভাষণের জাদুকরী মোহনীয় শক্তির উদ্দামতা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বাংলায় বাঙালির প্রতিটি শিরা উপশিরায়। বিজয়ের এই দিনে স্বশ্রদ্ধ সালাম এই মহান নেতার প্রতি। বিনম্র শ্রদ্ধা আর গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।
রাজাকার বাহিনী গঠন:
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধরত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে সহায়তা প্রদানকল্পে মে মাসে খুলনায় খান জাহান আলী রোডের একটি আনসার ক্যাম্পে ৯৬ জন পাকিস্তানপন্থী কর্মী নিয়ে হায়দ্রাবাদের ‘রাজাকার’-এর অনুকরণে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। ১ জুন জেনারেল টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তান রাজাকার অর্ডিন্যান্স ১৯৭১ জারি করে আনসার বাহিনীকে রাজাকার বাহিনীতে রূপান্তরিত করেন। তবে এর নেতৃত্ব ছিল পাকিস্তানপন্থী স্থানীয় নেতাদের হাতে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ৭ সেপ্টেম্বর জারিকৃত এক অধ্যাদেশ বলে রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীর সদস্যরূপে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য অংশেও রাজাকার বাহিনী গড়ে তোলা হয়।
প্রথম পর্যায়ে রাজাকার বাহিনী ছিল এলাকার শান্তি কমিটির নেতৃত্বাধীন। রাজাকার বাহিনীর প্রাথমিক পর্যায়ের প্রশিক্ষণের মেয়াদ ছিল ১৫ দিন। ১৯৭১ সালের ১৪ জুলাই কুষ্টিয়ায় রাজাকার বাহিনীর প্রথম ব্যাচের ট্রেনিং সমাপ্ত হয়। পূর্বা লীয় সামরিক অধিনায়ক জেনারেল এ.এ.কে নিয়াজী ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর সাভারে রাজাকার বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডারদের প্রথম ব্যাচের ট্রেনিং শেষে বিদায়ী কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরবর্তী পর্যায়ে রাজাকার বাহিনী একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তরের মর্যাদায় উন্নীত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে রাজাকার বাহিনীর স্বাভাবিক বিলুপ্তি ঘটে।
স্বাধীনতা অর্জিত হলেও থেমে থাকেনি রাজাকারদের সেই চক্রান্ত। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে যখনই সুসংগঠিত করা শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঠিক সেই সময়ই ক্ষমতালোভী কিছু উচ্ছৃঙ্খল সেনা সদস্য ৭৫’র ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এতেই ক্ষ্যান্ত হয়নি রাজাকার ও তাদের দোসররা। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একাধিকবার হত্যা চেষ্টা করে। তবে অবিচল ছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। তার দৃঢ়তায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইতিহাসের দায় শোধের পালা। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা এক মিনিটে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় এটি প্রথম কার্যকর হওয়া। এরপর একে একে ছয়জনকে ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে আমাদের থেকে বিদায় নিয়ে তাঁদের সহযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের দলে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের আকাশে একগুচ্ছ উজ্জ্বল তারকা হয়ে আমাদের নতুন প্রজন্মকে আশীর্বাদ দিচ্ছেন। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সকলেই দেশের লাল সবুজ পতাকার লাল বৃত্তের একটি অংশ হয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। আর তাঁদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব বাংলাদেশের সর্বকালের নতুন প্রজন্মের।
ইনিউজ ৭১/টি.টি. রাকিব