
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২২, ১:৩

জাটকা নিধন বন্ধ ও প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ, অভয়াশ্রম, জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ পালন, সাগরে ৬৫ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ এবং বিশেষ কম্বিং অপারেশনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করায় বরিশাল বিভাগে বেড়েছে ইলিশের উৎপাদন। তবে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগে বর্ষাকালে ইলিশের ভরা মৌসুম থাকলেও এখন আর তা নেই। অবশ্য সারা বছরই কমবেশি ইলিশ ধরা পড়ায় মোট উৎপাদনে কোনো প্রভাব পড়েনি বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।
বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে উৎপাদিত ইলিশের প্রায় ৭০ ভাগ উৎপাদন ও আহরণ হয় দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীসহ উপকূল সংলগ্ন সাগর এলাকায়।
এমনকি মাছ উৎপাদনে দেশ ২০১৬-১৭ সালে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও দক্ষিণাঞ্চল সে সফলতা অর্জন করেছে আরো ৫ বছর আগে। গত এক যুগে দেশে মৎস্য সেক্টরে প্রবৃদ্ধি শতকরা প্রায় ৫৩ ভাগ হলেও এ অঞ্চলে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৭৫ ভাগ। এ সময়ে দেশে ইলিশের উৎপাদন শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ বাড়লেও দক্ষিণাঞ্চলে প্রবৃদ্ধির হার ১১৫ ভাগ এর মতো। দক্ষিণাঞ্চলের ৬ জেলায় ৩ লাখ ২০ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে ২০২০-২১ অর্থবছরে মাছের উৎপাদন ছিল ৮ লাখ টনেরও বেশি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে শুধু বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় প্রায় সোয়া ৩ লাখ জেলে ইলিশ আহরণের সঙ্গে জড়িত। যার শতকরা ৬৫ ভাগ সার্বক্ষণিকভাবে কর্মরত রয়েছেন। ইলিশের প্রচলিত ভরা মৌসুম জুন থেকে আগস্ট। এই সময়ে সাগর ও নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে। যেগুলোর আকৃতিও বড়। কিন্তু এখন ইলিশের ভরা মৌসুমের পরিবর্তন খুব স্পষ্ট। ইলিশের প্রজনন ও বিচরণের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। বৃষ্টির মৌসুমে হেরফের হওয়ায় ইলিশের ভরা মৌসুমও সরে এসেছে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে।

জানা গেছে, ইলিশের ভরা মৌসুমে সাগর, অভয়াশ্রম আর নদ-নদীতে জাল ফেললেই ধরা পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। কিন্তু বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে ইলিশ মৌসুমের তারতম্য ঘটছে। আগে বর্ষাকালে ভরা মৌসুম হলেও এখন শীতকালেও ধরা পড়ছে ইলিশ।
ভরা মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদীতে কাক্সিক্ষত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে সাগরে ধরা পড়ছে প্রচুর পরিমাণে ইলিশ। এক সপ্তাহ ধরে জেলেদের জালে সাগরের যেসব ইলিশ মাছ ধরা পড়ছে, সেগুলোর বেশিরভাগেরই ওজন ২/৩ কেজি। জেলেরা বলছেন, এত বড় বড় ইলিশ বহু বছর পর ধরা পড়ছে জালে। ফলে ব্যস্ততা বেড়েছে জেলেদের। সরগরম হয়ে উঠেছে আড়তগুলো। বিগত দিনের ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন জেলেরা। উপকূলের একেকটি ঘাটে দিনে অর্ধকোটি থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ইলিশ কেনা-বেচা হচ্ছে।
অপরদিকে মৌসুম শুরুর প্রাক্কালে বরিশালের ইলিশ মোকামে প্রতি বছর এ সময় শত শত মণ ইলিশে সয়লাব থাকতো। ইলিশ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটত পাইকার, আড়তদারসহ শ্রমিকরা। কিন্তু চলতি ভরা মৌসুমে বরিশালের মোকাম ইলিশ শূন্য। বরিশালের ব্যবসায়ীরা জানান, নদীতে মাছ নেই। জেলেরা নদীতে গিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে শূন্য হাতে ঘাটে ফিরছে।
তবে সাগর থেকে আসা ট্রলারে ইলিশ আসছে বলে জানান তারা। যার প্রতিটি ইলিশের সাইজ এক থেকে দুই কেজি বা তারও বেশি। দামও বেশ চড়া।

তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে প্রতি কেজি ইলিশে দাম বেড়েছে ১৫০-২০০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগেও বড় সাইজের ইলিশের কেজি ছিল ১০০০-১১০০ টাকার মধ্যে। এখন বেড়ে ১২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের কেজি ছিল ৭৫০ টাকার মধ্যে। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৯০০ টাকা। আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছেন বলে অভিযোগ ক্রেতাদের।
এদিকে ভোলার আড়তদাররা জানান, এবার মাছের সরবরাহ অনেক বেশি। প্রতিদিন এ ঘাট থেকে ৫০-৬০ লাখ টাকার মাছ কেনা-বেচা হচ্ছে। কখনো আবার কোটি টাকার মাছ বিক্রি হচ্ছে। আগের তুলনায় সরবরাহ অনেক ভালো। এতে আড়তদাররাও খুশি, জেলেরাও খুশি। অপরদিকে বরগুনার পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষের পরের দিন ৬৭ লাখ ৫৬ হাজার ৮০০ টাকার মাছ বিক্রি হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) সূত্র জানায়, প্রথম দিনে বাজারে ১১ হাজার ৮৬৯ কেজি সামুদ্রিক মাছ বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে ইলিশ বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার ৭৮০ কেজি। এতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ৮৪ হাজার ৪৬০ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ৪৭৫ দশমিক ৯৩ টন ইলিশ ও ২ হাজার ৩২৪ দশমিক ২১ টন সামুদ্রিক নানা প্রজাতির মাছ বিক্রি হয়েছে অবতরণ কেন্দ্রটিতে।
এ ব্যাপারে ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্যাহ ভোরের কাগজকে বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলা ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৭৮ হাজার টন। অর্থবছরের শুরুতে সাগরের ইলিশ প্রচুর ধরা পড়লেও নদ-নদীতে এখনো ইলিশের দেখা মিলছে না। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে নদ-নদীতে ইলিশ ধরা পড়বে বলে তিনি আশাবাদী।
ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. বিমল চন্দ্র দাস বলেন, জলবায়ুর প্রভাবে ইলিশ উৎপাদনে কিছুটা তারতম্য হয়েছে। তবে ইলিশ উৎপাদন কমেনি, সময়ে কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে। এছাড়া সাগর, নদ-নদীতে সুস্বাদু পানির পরিমাণ আর পানির উচ্চতা কম এবং লবণাক্ততা থাকায় ইলিশের চলাচল পথ এবং জীবনচক্রের পরিবর্তনে ইলিশ মৌসুমেরও পরিবর্তন ঘটছে। তিনি গত বছর শুধু বরিশাল জেলায় ৪০ হাজার ৩০০ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছে। এ বছর তা বেড়ে ৪১ হাজার টন উন্নীত হবে বলে আশা করা যায়।
এদিকে ভরা মৌসুমেও নদ-নদীতে ইলিশের দেখা না মেলায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করছেন মৎস্য আড়তদার সমিতির নেতারা। তাদের মতে, বাংলাদেশে যখন ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলে তখন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অসাধু জেলেরা ইলিশ আহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে কাক্সিক্ষত ইলিশ পাচ্ছেন না দেশের জেলেরা।
দক্ষিণাঞ্চলের বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র পাথরঘাটা মৎস্য আড়তদার সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর জমাদ্দার বলেন, আমরা সরকারের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করতে পারিনা। তবে সাগরে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ক্ষেত্রে ভারতের সাথে সমন্বয় করে দেয়া উচিত, যাতে একই সময়ে আমাদের জেলেদের মতোই তারাও ইলিশ শিকার করতে না পারে।
এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাগুলোতে আলোচনা হচ্ছে জানিয়ে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।