প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২২, ২২:৪৫
নানা নাটকীয়তার মধ্যদিয়ে আগামীকাল (২৩ জুলাই) শেষ হচ্ছে সমুদ্রে মাছ শিকারের উপর ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে অধিকাংশ জেলেরা মাছ শিকারে ব্যস্ত সময় পার করেছে। সমুদ্রে ৬৫ দিনের অবরোধ শুধুমাত্র কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধতা ছিল। যার বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। অবরোধকালীন সময়ে কুয়াকাটা, আলীপুর-মহিপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, রাঙ্গাবালী, ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার স¤্রাটসহ উপকুলীয় এলাকার মৎস্য আড়তগুলো ছিল মাছে সরগরম।
জেলেদের আহরনকৃত মাছ রীতিমত খোলা বাজারে বিক্রি, দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজারজাতকরণ সবই চলে আসছিলো হাকডাকের মধ্যদিয়ে। মৎস্য অফিস, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ ও নৌ বাহিনী রহস্যজনক কারনে নিরব রয়েছেন অবরোধকালীন সময়ে। মাঝে মধ্যে নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ড মান রক্ষার অভিযান চালিয়ে গত ৬৫ দিনে প্রায় দেড় শতাধিক জেলেকে আটক করে জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দেয়। এবারের ৬৫ দিনের অবরোধের মধ্যে ভারতীয় জেলেদের আনাগোনাও ছিল চোখে পড়ার মত। বরফ উৎপাদনেও ব্যস্ত সময় পার করেছেন একাধিক বরফ কল মালিকরা।
অপরদিকে ভিন্ন চিত্রও দেখা গেছে জেলে পাড়া গুলোতে। অবরোধকালীন সময়ে মৎস্য অধিদপ্তরের দেয়া ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা মেনে মাছ শিকারে যায়নি এমন জেলেদের সংখ্যাও ছিল চার ভাগের একাংশ। সমুদ্রে প্রচুর পরিমান ইলিশ ধরা পরলেও এসব জেলেরা সরকারের আইন মেনে অবরোধের শেষের দিকে এসে সমুদ্রে নামার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। সমুদ্রে মাছ শিকার থেকে বিরত থাকা জেলেরা জানান, সরকার আমাদের ভালোর জন্যই অবরোধ দিয়েছে। যার সুফল আমরা জেলেরাই ভোগ করবো। আর যারা আইন না মেনে সমুদ্রে মাছ শিকার করেছেন তারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করেছে।
তবে জেলেদের অনেকেরই অভিযোগ আড়তদাররা প্রশাসনের সাথে আতাঁত করে সমুদ্রে মাছ শিকারে নামতে বাধ্য করেছে জেলেদের। সরকারের আইন বাস্তবায়ন না করে বিশেষ সুবিধা নিয়ে জেলেদের সমুদ্রে নামতে উৎসাহিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন এমন দাবী অনেকেরই।
যেসকল জেলেরা অবরোধকালীন সময়ে মাছ শিকার করেনি তারা ইলিশ ধরার স্বপ্নে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ২৩ জুলাই শনিবার রাত বারোটার পর এসব জেলেরা সাগরে যাবে। ইতোমধ্যে ট্রলার মেরামত, নতুন জাল তৈরি ও পুরনো জাল সেলাইসহ সমুদ্রে মাছ ধরার সকল সরঞ্জাম প্রস্তুতি শেষ করে অপেক্ষায় আছেন উপকুলীয় এলাকার হাজার হাজার জেলে মৎস্যজীবীরা।
জানা গেছে, দেশের সামুদ্রিক জলসীমায় মাছের প্রজনন বাড়াতে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত সব ধরনের মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে মৎস্য অধিদপ্তর।
শনিবার রাত ১২টার পরই মৎস্য শিকারিরা নেমে পড়বেন রুপালি ইলিশের সন্ধানে। প্রচুর ইলিশ শিকার করে দাদন ও ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হবে এমনটাই প্রত্যাশা জেলেদের।
কুয়াকাটার জেলে দেলোরার মোল্লা বলেন, আমরা সব সময় সরকারি নির্দেশ মেনে গভীর সমুদ্রে মৎস্য শিকার থেকে বিরত রয়েছি। এখন নৌকা জাল প্রস্তুত করা হয়েছে। শনিবার রাত ১২টার পর সমুদ্রে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো। আমরা আশা করছি সাগরে প্রচুর পরিমাণ ইলিশ ধরা পরবে।
দেশের অন্যতম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র আলীপুরের জেলে মনির মাঝি বলেন, সরকার ঘোষিত ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা আমরা পালন করেছি। আমরা এরই মধ্যে ইলিশ মাছ ধরার সব প্রস্তুতি শেষ করেছি। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় অপেক্ষায় আছি। আবহাওয়া অনুকলে থাকলে শনিবার মধ্য রাতে মাছ শিকারে যাবো। মহিপুর মৎস্য বন্দরের একাধিক জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর ইলিশের ভরা মৌসুমে ইলিশ না পেয়ে উপকুলের জেলেরা ধার দেনা করে কোন রকম সংসার চালিয়েছে। অবরোধ শেষে সমুদ্রে ইলিশ ধরা পড়লে দেনা পরিশোধ করতে পারবেন তারা।
কুয়াকাটা আশার আলো পুনর্বাসন মৎস্যজীবী জেলে সমবায় সমিতির সভাপতি মোঃ নিজাম শেখ বলেন, অবরোধকালীন সময়ে যদি প্রতিবেশী দেশের জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমানায় মাছ ধরতে না পারে তাহলে আমরা ৬৫ দিনের অবরোধ শেষে এর সুফল পাবো। জেলেদের জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে। আমাদের জেলেরা দেনা পাওনা দিয়ে ভালো ভাবে জীবনযাপন পারবে।
আলীপুর মৎস্য আড়তদার মালিক সমিতির সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ আনছার উদ্দিন মোল্লা বলেন, এ বছর অবরোধকালীন সময়ে অনেক জেলে ট্রলার মেরামতের নামে অন্যাত্র গিয়ে সমুদ্রে মাছ শিকার করেছে। তবে তিনি দাবী করেন আলীপুর-মহিপুর বন্দরের জেলেদের বেশিরভাগই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মাছ শিকার থেকে বিরত ছিল। তিনি বলেন, অবরোধকালীন সময়ে ৫৬ কেজি করে জেলেদের চাল দেয়া হয়েছে। অচিরেই আরো ৩০ কেজি চাল দেয়া হবে।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেছেন, এবার ৬৫দিন অবরোধ আমাদের অনেকটা সহযোগিতা করছে জেলেরা। তিনি বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে দেখছি জেলেরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। গভীর সমুদ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এবার সরকারি তরফ থেকে জেলেদের সহযোগিতা করা হয়েছে, তিনি আরো বলেন, আমরা দিন-রাত মা ইলিশ রক্ষায় কাজ করেছি। আশা করছি, আমরা এ বছর শতভাগ সফল হয়েছি।
কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, অবরোধ চলাকালীন সময়ে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টিসহ বজ্রপাত হয়েছে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাত হলে সব ডিমওয়ালা মা মাছ দ্রুত ডিম ছেড়ে দেয়। এতে সমুদ্রে প্রচুর পরিমাণ ইলিশ মাছ ধরা পরবে জেলেদের জালে। তবে এই মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্যের সাথে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছেন। নাম প্রকাশে অনুচ্ছুক অনেক মৎস্যজীবিরাই জানিয়েছে চলতি বছর অবরোধের মধ্যে হাজার হাজার ট্রলার সমুদ্রে মাছ শিকার করলেও মৎস্য কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক।