প্রকাশ: ২ আগস্ট ২০২১, ২৩:৪
পর্যটন নগরী কুয়াকাটার ক্ষুদ্র নৃজাতিগোষ্ঠি রাখাইনদের ইতিহাস ঐতিহ্য ও প্রাচীন নিদর্শন সমুহ দখল দূষণে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। প্রায় দুই ’শ বছরের পুরাতন মন্দিরের সম্পত্তি ও মগন সম্পত্তি লোভের বসবতি হয়ে এক শ্রেণির অসাধু রাখাইনরা বিক্রি করে দিচ্ছে।
এতে করে আদিবাসী রাখাইনদের পুরাকৃতিসহ তাদের প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্য বিলুপ্তি হতে বসেছে।
সম্প্রতি কুয়াকাটার মিশ্রিপাড়ায় দেবালয়ের সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন পাড়ার রাখাইনদের সমন্বয়ে মানববন্ধন করেছে সাধারণ রাখাইনরা। তারপরও দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি দেবালয়ের জায়গা। কুয়াকাটা-ঢাকা মহাসড়ক লাগোয়া রাখাইনদের ঠাকুর বাড়ি এবং দেবালয়ের ৯৯ শতাংশ জমি কাগজে কলমে থাকলেও দখলে রয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ।
একটি বিরাট অংশ বেদখলে ছাড়াও অবশিষ্টাংশ বিক্রির অপতৎপরতা চালাচ্ছে খোদ রাখাইনদেরই একটি অংশ। যেখানে রয়েছে রাখাইনদের ধর্মযাজকদের শ্মশানসহ পুরাকৃতি। সেখানকার বড় একটি অংশ দখল করে খুদরাত-ই খুদা নামে এক আবাসন ব্যবসায়ী সেমিপাকা স্থাপনা তৈরী করছে।
রাখাইনদের একটি সূত্র দাবী করেন, ওই আবাসন কোম্পানীটি তাদের উন্নয়ন কাজ করতে গিয়ে একটি আদি ‘কুপ বা কুয়া’ এবং একটি ‘মঠ’ মাটিচাপা দিয়েছে।
অপরদিকে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্টে অবস্থিত কেরানী পাড়া ও শ্রী মঙ্গল বৌদ্ধ বিহার। রাখাইনদের একাংশের দাবী, কেরানী পাড়ার পূর্ব ও উত্তর পাশ ঘেঁষে ৫৬ শতক জমি দেবালয়ের নামে দলিল ও কাগজপত্র রয়েছে।
দেবালয়ের ওই সম্পত্তিতে দেশের একটি খ্যাতনামা বহুজাতিক কোম্পানী ব্যাংক ও ওশান ভিউ নামে বহুতল আবাসিক হোটেল নির্মাণ করেছে। দেবালয়ের ওই সম্পত্তি রাখাইনদেরই প্রভাবশালী গ্রুপ বিক্রি করেছে ওই বহুজাতিক কোম্পানীর কাছে।
আবার কেউ কেউ পাড়ার ওয়াক্ফকৃত জমিতে বহুতল বাণিজ্যিক ভবনসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। রাখাইনদের এসব পুরাকৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষায় প্রতœতত্ত্ব বিভাগ উদ্যোগ গ্রহণ করলেও তা এখন অতিলোভি কতিপয় রাখাইনদের কারনে ভেস্তে যেতে বসেছে।
এতে সহযোগিতা করছেন স্থানীয় এক শ্রেণির ভূমি দালাল ও জনবিচ্ছিন্ন জনপ্রতিনিধিরা। এসব নিয়ে রাখাইনরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। রাখাইনদের বিক্ষুব্ধ অংশটি তাদের পুরাকৃতিসহ ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষায় জেলা প্রশাসনের কাছে সাহায্য চেয়েছেন।
জেলা প্রশাসন রাখাইনদের ওয়াক্ফকৃত মগন সম্পত্তি ও দেবালয়ের জমির মালিকানা জটিলতা নিরসনে কিছুটা বিলম্বে হলেও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
বিরোধীয় জমির মালিকানা জটিলতা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত সকল ধরনের কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য নির্দেশও দিয়েছে জেলা প্রশাসন। তবে ভূমি জরিপ কর্তৃপক্ষ অসৎ ব্যক্তিদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন ব্যক্তির নামে এসব জমি জরিপ করে দিয়ে গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
ফলে মালিকানা জটিলতা নিরসনে দীর্ঘসূত্রিতা বলেও জানান স্থানীয় ভূমি প্রশাসন। কবে নাগাদ এ সমস্যার সমাধান হবে তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছেন না। এ চিত্র শুধু কুয়াকাটাতেই নয়, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার রাখাইন পাড়া গুলোতেও।
উন্নত জীবনযাপনের লক্ষ্যে রাখাইনরাই রাখাইনদের ইতিহাস ঐতিহ্য বিলুপ্ত করে দিয়ে নিজেদেরকেই অস্থিত্ব সংকটে ফেলেছেন বলেও মনে করছেন সচেতন মহল।
কুয়াকাটা কেরানী পাড়ার রাখাইন অধিকার আন্দোলনের নেত্রী লুমা মগনী বলেন, এ পাড়ার প্রভাবশালী রাখাইন নেতা এমং তালুকদার ও তেমং রাখাইন দুইশত বছরেরও অধিক পুরানো ঠাকুর বাড়ি ও মগন ওয়াক্ফকৃত জমি সাতটি পাড়ার কতিপয় স্বার্থান্বেষী রাখাইনদের সমন্বয়ে জেলা প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই খুদরাত-ই খুদা নামে এক আবাসন ব্যবসায়ীর সাথে বিক্রির উদ্দেশ্যে বায়না চুক্তি করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
সেখানে তাদের একটি বৌদ্ধ মঠ ও আদি কুয়া মাটি চাপা দিয়ে দিয়েছে। ওই জমিতে তারা সেমিপাকা ঘর নির্মাণ করেছে। কুয়াকাটা শ্রী মঙ্গল বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওয়েন মং উচু বলেন, রাখাইনদের দেবালয় ও মগন সম্পত্তি ওয়াক্ফ করা।
এসব সম্পত্তি বিক্রির এখতিয়ার কারো নেই। ওয়েন মং উচু একটি বহুজাতিক কোম্পানীর নাম উল্লেখ করে বলেন, কেরানী পাড়ার প্রভাশালী দুই পরিবারের সাথে গোপন চুক্তির মাধ্যমে পাড়ার দুই দিক দখল করেছে। ওই কোম্পানীটি দেবালয়ের জমি ক্রয় না করেও তাদের সম্প্রদায়ের একাংশের সহযোগিতায় ওই জমিতে ব্যাংকসহ বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে।
রাখাইনদের পুরাকৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্য রক্ষায় বাংলাদেশ কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্ম বিষয়ক সহ সম্পাদক ও বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘ পটুয়াখালী-বরগুনা জেলার সভাপতি নিউ নিউ খেইন বলেন, এক শ্রেনীর ভূমি দালালদের সহযোগিতায় অস্থিত্ববিহীন ভূমির মালিকানা সৃস্টি করে রাখাইনদের একটি অংশের সহযোগিতায় তাদের আদি পুরাকৃতি ধ্বংসে মেতে উঠেছে ভূমিগ্রাসী চক্র। আমরা এদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য উপজেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি। উপজেলা প্রশাসন তদন্ত সাপেক্ষে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা নিবার্হী অফিসার আবু হাসনাত মোহাম্মাদ শহিদুল হক বলেন, এ অঞ্চলের ইতিহাস ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে ক্ষুদ্র নৃজাতিগোষ্ঠি রাখাইন সম্প্রদায়। এদের দেবালয়ের সম্পত্তি বেদখল কিংবা কেউ বিক্রি করতে চাইলেও আমরা আইনী বিষয়গুলো খতিয়ে দেখব।