
প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ১:১৯

মানুষের অদম্য ইচ্ছা থাকলে কোনো বাধাই যে তাকে আটকাতে পারে না সেটি প্রমাণ করেছেন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হাফিজুর রহমান। সকল বাধা ডিঙ্গিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন আলোকিত জীবনের পথে। জীবন তাকে অনেক কিছু না দিলেও তার প্রাপ্য ঠিকই আদায় করে নিচ্ছেন প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
একজন সহযোগীর সাহায্য নিয়ে যাকে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে হয়, যে কিনা মুখে কলম ধরেই সম্মানের সহিত অতিক্রম করেছে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বলছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) অতিপরিচিত মুখ হাফিজুর রহমানের কথা। যিনি জন্মগতভাবেই অপরস্ফুটিত দুই হাত ও দুই পার অধিকারী।
হাফিজুর রহমান ১৯৯৩ সালে ধুনট উপজেলার বেলকুচি গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম নেন। বাবা পৌঢ় পক্ষাপঘাতের রোগী মফিজ উদ্দিন সাধারণ কৃষক। মা ফিরোজা বেগম গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া হাফিজুরের পড়ালেখা ও যাবতীয় ভরণপোষণ হয়েছে পরনির্ভশীলতায়। মাঝে সরকারের দেয়া ভাতা, গ্রামের সাহায্য সহযোগিতা ও ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের টিউশনি করিয়ে নামমাত্র অর্থ উপার্জন করেছেন। চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট তিনি। বিয়ে করে সংসার নিয়ে ব্যস্ত হাফিজের তিন ভাই।
ছোটবেলায় বাবার কাছেই ‘বর্ণ পরিচয়’ শেখা হাফিজুরের। বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে ব্র্যাক স্কুলে শুরু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন। ওই সময় বেয়ারিংয়ের গাড়িতে করে সহপাঠীরা স্কুলে নিয়ে যেত তাকে। এভাবেই স্কুলে যাওয়া-আসার মধ্যে ২০০৯ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.১৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন জ্ঞানপিপাসু হাফিজুর। তারপর অত্র উপজেলার ধুনট ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১১ সালে এইচএসসিতে জিপিএ ৩.৬০ পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি।
২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে কোনো ভর্তি কোচিং না করেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান করে নেন হাফিজুর। ভর্তি হন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে। পরীক্ষার হলে মেঝেতে পার্টিতে বসে ছোট টুলে খাতা রেখে মুখ দিয়ে লিখে পরীক্ষা দিয়ে গেছেন এ শিক্ষার্থী।

হাফিজুর রহমান বলেন, একসময় সবাই বলত আমার পক্ষে উচ্চশিক্ষা নেয়া সম্ভব নয়, হাল ছেড়ে দিয়ে অন্য কোনো পরিকল্পনা করতে। কিন্তু আজ আমি মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি। এটা জেনে আমার এলাকার অনেকেই গর্ব বোধ করেন। গত ২০০৯ সালে মুখে কলম ধরে লিখে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারণার সুবাদে বেশ ক’জন ব্যক্তি ও সংস্থা তার লেখাপড়া চালিয়ে যাবার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। উপজেলা সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে মাঝে মাঝে সরকারের দেয়া কিছু শিক্ষাবৃত্তিও পেতেন এ মেধাবী যুবক। তবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে তা আর নেই।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, যদি আমাকে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো চাকরি দেয়া হয় তবে আমার জন্য বড় উপকার হবে। গত বছরের এপ্রিলে অত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে সেকশন অফিসারের পদের জন্য আবেদন জানালেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও সাড়া পাননি তিনি।
ইনিউজ ৭১/টি.টি. রাকিব